Friday, March 6, 2026
32.6 C
Kolkata

ভয়ের বার্তা ছড়াতে মসজিদে অবমাননা: ত্রিপুরার ধলাইয়ে আতঙ্কে সংখ্যালঘু বাসিন্দারা

ত্রিপুরার ধলাই জেলায় একটি মসজিদে অবমাননার ঘটনা ঘিরে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয় মুসলিম সমাজের মধ্যে। বাসিন্দা ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি নিছক কোনও দুষ্কৃতী কাজ নয়—বরং পরিকল্পিতভাবে ভয় দেখানো ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার চেষ্টা।

ধলাই জেলার মানু–চাওমানু রোডের ধারে অবস্থিত মাইনামা জামে মসজিদে এই ঘটনা ঘটে ২৪ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার। অভিযোগ, অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন দুষ্কৃতী মসজিদের ভেতরে মদের বোতল রেখে যায় এবং মসজিদের কিছু অংশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে।

ঘটনাটি সামনে আসে তখনই, যখন মসজিদের ইমাম নামাজের প্রস্তুতির জন্য সেখানে পৌঁছান। ঢুকেই তিনি দেখতে পান নামাজের জায়গার ভেতরে রাখা রয়েছে একাধিক মদের বোতল—যা মুসলিম ধর্মের কাছে চরম অপমান।

এতেই শেষ নয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি হুমকিমূলক হাতে লেখা নোট এবং বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত একটি পতাকাও উদ্ধার হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে রেখে যাওয়া হয়েছে মুসলিমদের ভয় দেখানোর জন্য এবং এলাকায় ইসলামবিদ্বেষ ছড়াতে।

হুমকির নোটে লেখা ছিল—
“Jai Shree Ram. This is the first and last warning today. Something big is going to happen next time. Bajrang Dal. Jai Shree Ram।”
নোটে তারিখ দেওয়া ছিল ২৫-১২-২০২৫ এবং সময় ১২:০৭ PM।

নোটের শেষাংশে বাংলায় লেখা—
“এটি তোমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সাবধানে থেকো এবং ভালো করে শোনো। সামান্য ভুলও ক্ষমা করা হবে না।”

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মাইনামা জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন,
“মসজিদের ভেতরে মদের বোতল রাখা আমাদের ধর্মের উপর সরাসরি আঘাত। এটা কোনও দুর্ঘটনা নয়, ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে—যাতে আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এবং এলাকায় অশান্তি তৈরি হয়।”

তিনি আরও জানান,
“সেদিন আমরা সবাই পানিসাগর এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেই সময়ই এই ঘটনা ঘটে। ফিরে এসে দেখি মসজিদের কিছু অংশে আগুন লাগানো হয়েছিল, যদিও তা নিভে গিয়েছিল। সেখানে কিংফিশার মদের বোতল, ‘জয় শ্রী রাম’ লেখা পতাকা এবং হুমকির চিঠি পাওয়া যায়।”

ঘটনার পরই পুলিশকে খবর দেওয়া হয় এবং সমস্ত প্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইমাম।
“আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। কিন্তু এই ধরনের কাজ সমাজের সৌহার্দ্য নষ্ট করে। আমরা চাই প্রশাসন দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিক,” বলেন তিনি।

মাওলানা সাইফুল ইসলাম আরও বলেন,
“এই এলাকায় সবচেয়ে বেশি খ্রিস্টান মানুষ থাকেন। তাঁদের পরে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিমরা বসবাস করেন। এতদিন সবাই মিলেমিশে, সম্মানের সঙ্গে থেকেছে। কিন্তু বজরং দলের মতো সংগঠন মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করছে।”

ঘটনার পর মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে চাওমানু থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২৪ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট নাগাদ অজ্ঞাত দুষ্কৃতীরা মসজিদে ঢুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এবং আগুন লাগিয়ে বড়সড় বিপর্যয়ের চেষ্টা করে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সময়মতো বিষয়টি নজরে না এলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।

চাওমানু থানার এক সহকারী উপ-পরিদর্শক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ঘটনাস্থল থেকে হুমকির চিঠি ও পতাকা উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

পুলিশের বক্তব্য, “ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষী প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই ঘটনার পর ধলাই জেলায় সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বহু মানুষ প্রশ্ন তুলছেন—ধর্মীয় সহাবস্থানের এই রাজ্যে কি সত্যিই তারা নিরাপদ?

Hot this week

শান্তিপুরে বিজেপি পার্টি অফিসে এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ , জেলা সহ-সভাপতির নাম জড়িত!

নদিয়ার শান্তিপুরে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ, এক...

Topics

শান্তিপুরে বিজেপি পার্টি অফিসে এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ , জেলা সহ-সভাপতির নাম জড়িত!

নদিয়ার শান্তিপুরে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ, এক...

ইরানের নেতৃত্বে কি বসতে চলেছেন খামেনেই-র পুত্র?

ইরানের রাজনীতিতে শিগগিরই বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দেশের...

পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালী ঘিরে কড়া অবস্থান নিলো ইরান

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে ইরান নিজেদের নিরাপত্তা...

তামিলনাড়ুতে জাতিগত হামলা: প্রতিবন্ধী দলিত ও ওড়িশার শ্রমিক নিহত, অভিযুক্তদের আগে রয়েছে সহিংসতার ইতিহাস

তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার নাঙ্গুনেরি এলাকার পেরুমপাথ্তু গ্রামে ভয়াবহ হামলার...

Related Articles

Popular Categories