পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে ফের উঠল একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। রাজ্য সরকারের বড় প্রতিশ্রুতি হিসেবে ২০১৭-১৮ সালে যে ১১টি “স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়” গড়ে তোলার ঘোষণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার অনেকটাই আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে। অভিযোগের আঙুল উঠছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস-এর দিকে। তৎকালীন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের আর বাইরে যেতে হবে না, বাংলাতেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি।
তথ্য অনুযায়ী, ঘোষিত ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৭টির এখনও নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। শুধু তাই নয়, ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী শিক্ষকও নেই। অনেক ক্ষেত্রেই ক্লাস শুরু হয়েছে দেরিতে, মূলত ২০২১ সাল থেকে, এবং তারপরও উন্নয়নের গতি খুবই ধীর। অর্থ বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.৮ শতাংশে। অন্যদিকে, অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন (২০২১-২২) অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার ২৬.৩ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ২৮.৪ শতাংশের থেকে কম।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ২০২২ সালের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনা, যা রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা অনেকটাই নষ্ট করেছে। পাশাপাশি, রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনও প্রশাসনিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২১ সালে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিল ১৩৬ জন ছাত্রছাত্রী, যার মধ্যে ৩৯ জন মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেয়। পরের বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়—১০৫ জনের মধ্যে ৬৯ জনই কোর্স শেষ করার আগেই সরে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে ১৩৩ জন ভর্তি হলেও ৯২ জন ড্রপআউট হয়।
নদিয়ার কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী জানাচ্ছেন, সেখানে হোস্টেল না থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১০০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরাও বলছেন, স্থায়ী ঠিকানা বা পরিকাঠামো না থাকলে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো চালানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে পরিকাঠামোর অভাবের উদাহরণও কম নয়। দক্ষিণ দিনাজপুরে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে শুধু পাঁচিল তৈরি হলেও মূল নির্মাণ কাজ থেমে আছে। হাওড়ার হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভবন তৈরি হলেও এখনও তা ব্যবহার শুরু হয়নি। দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটির ক্ষেত্রেও কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ সত্ত্বেও কাজ প্রায় এগোয়নি।
জানা গিয়েছে , রাজ্যের উচ্চশিক্ষা নিয়ে বড়সড় পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি স্পষ্ট। বিরোধীদের দাবি, শুধুমাত্র ঘোষণা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।


