বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের মূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলি সমাধান করতে ব্যর্থ হয়ে, এবার পুনরায় মেরুকরণের রাজনীতিকে চাঙ্গা করতে ময়দানে নামল কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি। দেশজুড়ে তীব্র বেকারত্ব, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলির সুরক্ষায় নিজেদের চরম ব্যর্থতা আড়াল করতে এবার তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশ এবং জনবিন্যাসের চরিত্র বদল খতিয়ে দেখার নাম করে একটি উচ্চস্তরীয় কমিটি গঠন করল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক মাধ্যমে ঘটা করে এই কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নওলেকরকে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটছে, সেই ব্যর্থতা স্বীকার না করে উল্টে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীকে নিশানা করতেই নির্বাচনের আগে এই কমিটি গঠনের নাটক সাজিয়েছে মোদী সরকার।
কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা এই উচ্চস্তরীয় কমিটির সদস্যদের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন দেশের বর্তমান জনগণনা কমিশনার, প্রাক্তন আইএএস কর্মকর্তা দুর্গাশঙ্কর মিশ্র, প্রাক্তন আইপিএস কর্মকর্তা বালাজি শ্রীবাস্তব এবং অর্থনীতিবিদ শমিকা রবি। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব (বিদেশি-১) এই কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সামাজিক মাধ্যমে অমিত শাহ দাবি করেছেন যে, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য জনবিন্যাসের এই পরিবর্তন নাকি একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে তিনি এই বিষয়টিকে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা এবং আদিবাসী সমাজের সংরক্ষণের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে দেশবাসীর মনে নতুন করে ভীতি ও বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেছেন। অথচ কেন্দ্রের ক্ষমতা হাতে থাকার পরও কেন এতদিন সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা গেল না, তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পূর্ণ নীরব।
গত কয়েক বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে এসে ধারাবাহিকভাবে জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার অভিযোগ তুলে মেরুকরণের তাস খেলছেন অমিত শাহ। এমনকি গত বছর স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লালকেল্লার বক্তৃতাতেও সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে এই একই প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছিল। নতুন এই কমিটি গঠনের আসল উদ্দেশ্য যে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করা, তা শাহের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার। তিনি লিখেছেন যে, এই কমিটি অবৈধ অভিবাসন এবং তথাকথিত অস্বাভাবিক কারণের ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে চলা সামাজিক ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বিস্তারিত মূল্যায়ন করবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করবে। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, নিজেদের এক দশকের জমানায় দেশের সীমান্ত রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়া বিজেপি সরকার এখন স্রেফ ধর্মীয় মেরুকরণ এবং বিভাজনের তাস খেলে আগামী নির্বাচনগুলিতে বৈতরণী পার হতেই এই ধরণের সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল চালছে।


