সে আমাদের কথা দিয়েছিল যে সে শীঘ্রই ফিরে আসবে।” চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে এভাবেই ছেলের শেষ স্মৃতিচারণ করছিলেন ৭০ বছর বয়সী রামজি চৌরাসিয়া। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর পূরণ হলো না। ওমান উপকূলে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলায় নিহত তিন ভারতীয় নাবিকের একজন ছিলেন তাঁর বড় ছেলে শিবানন্দ চৌরাসিয়া।
৩৭ বছর বয়সী শিবানন্দ গত ছয় মাস ধরে পালাউ-এর পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘এমটি সেত্তেবেলো’-তে ইঞ্জিন পেটি অফিসার (ফিটার) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ৯ জুন ওমান উপকূলে হামলার ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলার সিরাউলি গ্রামের বাসিন্দা শিবানন্দের পরিবার জানায়, গত এক মাস ধরেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে তাঁরা উদ্বেগে ছিলেন। বিভিন্ন সংবাদে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়ার খবর প্রকাশিত হওয়ায় পরিবারের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছিল।
রামজি চৌরাসিয়া জানান, কয়েক বছর আগে সংসারের হাল ধরতে শিবানন্দ বাড়ি ছেড়ে পুনেতে ওয়েল্ডারের কাজ শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। গত বছরের নভেম্বরে তিনি পরিবারকে জানান যে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ভালো বেতনের চাকরি পেয়েছেন। এরপর মুম্বাই হয়ে ৫ ডিসেম্বর জাহাজে যোগ দিতে রওনা হন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে শিবানন্দ তাঁর স্ত্রী সুশীলা, ছয় বছরের ছেলে সমর, দুই বছরের মেয়ে বামিকা এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তখন তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন।
রামজি বলেন, “শেষবার ছেলেকে দেখার পর ছয় মাসেরও বেশি সময় কেটে গেছে। সে বলেছিল শিগগিরই ফিরে আসবে। আমরা সবাই সেই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম।”
ঘটনার খবর প্রথম জানতে পারেন শিবানন্দের ছোট ভাই রাম প্রবেশ, যিনি বর্তমানে দুবাইয়ে ওয়েল্ডার হিসেবে কাজ করছেন। তিন মাস আগে শিবানন্দের সহায়তায় তিনি ওই চাকরি পেয়েছিলেন। হামলার পর ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে শিবানন্দের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
এই খবরে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা কালাবতী দেবী ও স্ত্রী সুশীলা। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গোটা বাড়ি। রামজি বলেন, “আমাদের মাত্র কয়েক কাঠা জমি আছে। সেখান থেকে সংসার চলে না। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল শিবানন্দ। সম্প্রতি সে নিজের বোনের বিয়ের ব্যবস্থাও করেছিল।”
নিম্ন-মধ্যবিত্ত এই পরিবারের আশা ছিল, জাহাজে ভালো চাকরির মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটবে। কিন্তু শিবানন্দের আকস্মিক মৃত্যু সেই সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর বাবা বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম এবার হয়তো আমাদের কষ্ট কমবে। সে নিজের ছোট ভাইয়ের জন্যও বিদেশে কাজের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু এখন আমাদের সব আশা শেষ হয়ে গেছে।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে রামজি জানান, ঘটনার পর মাত্র দুজন পুলিশ কনস্টেবল এসে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে গেছেন। তবে এখনও পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেননি বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী রামেশ্বর শাহী বলেন, “শিবানন্দ খুব পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল মানুষ ছিল। ছোটবেলা থেকেই সে কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তার মৃত্যুর খবর শুনে পুরো গ্রাম শোকাহত।”
দেওরিয়ার জেলাশাসক মধুসূদন হুলগি জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন পরিবারটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য রাজ্য সরকার ও বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
একজন পরিশ্রমী শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নকেই ভেঙে দেয়নি, বরং বিদেশে কর্মরত হাজারো ভারতীয় নাবিকের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।


