বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে এটি শুধুমাত্র একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং এক আবেগের নাম। বিশ্বকাপের একটি টিকিট সংগ্রহ করতে সমর্থকদের দীর্ঘ অপেক্ষা, অনলাইন দৌড়ঝাঁপ এবং কখনও কখনও বিপুল অর্থ খরচ করতেও দেখা যায়। অথচ সেই বিশ্বকাপেই দেখা গেল এক বিস্ময়কর দৃশ্য—স্টেডিয়ামের শত শত আসন ফাঁকা।
শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত চেক প্রজাতন্ত্র বনাম দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচে এই চিত্র ধরা পড়ে। মেক্সিকোর গুয়াদালাজারা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে দক্ষিণ কোরিয়া ২-১ গোলে চেক প্রজাতন্ত্রকে পরাজিত করে। মাঠে দুই দলই গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিলেও গ্যালারিতে প্রত্যাশিত দর্শক সমাগম দেখা যায়নি।
টেলিভিশন সম্প্রচার এবং মাঠে উপস্থিত সাংবাদিকদের বর্ণনায় স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য আসন খালি দেখা গেছে। বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় এমন দৃশ্য খুবই বিরল বলেই মনে করছেন অনেকে।
তবে দর্শক উপস্থিতি নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছে ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৪৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন ৪৪ হাজার ৯৮৫ জন। অর্থাৎ প্রায় পূর্ণ গ্যালারিতেই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি তাদের। যদিও মাঠে থাকা একাধিক সাংবাদিকের মতে, বাস্তবে দর্শকসংখ্যা সেই হিসাবের তুলনায় অনেক কম ছিল।
এই পরিস্থিতির কারণ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, চেক প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া—দুটি দলই আন্তর্জাতিক ফুটবলে সম্মানজনক অবস্থানে থাকলেও ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো বিশ্বজোড়া সমর্থকভিত্তি তাদের নেই। পাশাপাশি দুই দলের স্কোয়াডে বর্তমান সময়ে তেমন বৈশ্বিক তারকাও নেই, যা নিরপেক্ষ দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারত।
আরও একটি কারণ হিসেবে উঠে আসছে ভৌগোলিক দূরত্ব। মেক্সিকো থেকে চেক প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া উভয়ই অনেক দূরে অবস্থিত। ফলে দুই দেশের বিপুল সংখ্যক সমর্থকের পক্ষে মাঠে উপস্থিত হওয়া সহজ হয়নি। এছাড়া চেক প্রজাতন্ত্র শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ায় সমর্থকদের ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য পর্যাপ্ত সময়ও ছিল না বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে টিকিটের মূল্যকে কেন্দ্র করে। বিশ্বকাপের বিভিন্ন ম্যাচের টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। সমর্থকদের অভিযোগ, টিকিট, বিমানভাড়া, আবাসন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া অনেক সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এই প্রসঙ্গে ফিফা সভাপতি Gianni Infantino আগেই যুক্তি দিয়েছিলেন, টিকিটের দাম কম রাখা হলে কালোবাজারির ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাঁর মতে, কম মূল্যের টিকিট পুনরায় বিক্রি করে অসাধু চক্রগুলো অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ পেত।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, কালোবাজারি ঠেকানোর জন্য টিকিটের মূল্য এতটাই বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কি না, যার ফলে সাধারণ সমর্থকরাই ম্যাচ দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের মতে, বিশ্বকাপের আসল প্রাণশক্তি গ্যালারিভর্তি দর্শক এবং ফুটবলপ্রেমীদের অংশগ্রহণ। যদি টিকিটের মূল্য সেই দর্শকদেরই দূরে সরিয়ে দেয়, তাহলে তা টুর্নামেন্টের আবহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচের ফাঁকা গ্যালারি সেই বিতর্ককেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক উৎসবে দর্শক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে টিকিট নীতিতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন জোরালো হচ্ছে।

