রাজ্যের প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরণকে নতুন করে সংস্কার ও পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, এই কাজে আগ্রহ দেখিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে প্রাথমিক প্রস্তাব পাওয়ার পর আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি সংস্কার ও ‘রি-ইম্যাজিনিং’-এর কাজ হাতে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই আদানি গোষ্ঠীর পরামর্শদাতা তথা অবসরপ্রাপ্ত আইএএস সঞ্জয় ধাডে এবং রাজ্য পূর্ত দফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার বিনয় মজুমদার যৌথভাবে রাইটার্স বিল্ডিং পরিদর্শন করেছেন। ওই পরিদর্শনের পর প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, গোটা ভবনটির সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্যায়নে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে সংস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নবান্ন সূত্রে খবর, প্রস্তাবটি এখনও সরকারের বিবেচনাধীন। ঐতিহাসিক এই ভবনের বর্তমান কাঠামোগত পরিস্থিতি, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, কারিগরি বিষয় এবং সরকারি বিধি-নিয়ম খতিয়ে দেখার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ‘হেরিটেজ গ্লোরি’ পুনরুদ্ধার করা। একইসঙ্গে ভবনটির ঐতিহাসিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সৌন্দর্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
রাইটার্স বিল্ডিংকে বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে নতুন করে তুলে ধরার বিষয়টিও প্রস্তাবের অংশ। দীর্ঘদিনের পুরনো এই ভবনকে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তা নিয়েও প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের মতো ঐতিহাসিক সরকারি ভবনে কোনও সংস্কার বা পরিবর্তনের আগে তার কাঠামোগত অবস্থা, সংরক্ষণযোগ্য অংশ, প্রয়োজনীয় মেরামতি এবং সম্ভাব্য কাজের পরিধি নির্ধারণ করা জরুরি। সেই কারণেই আদানি গোষ্ঠীর পরামর্শদাতা এবং রাজ্য পূর্ত দফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ারের যৌথ পরিদর্শনকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
সূত্রের খবর, পরিদর্শনের মাধ্যমে ভবনটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ত দফতরের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রস্তাবটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা নির্ধারণ করা হতে পারে।
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সঙ্গে কলকাতা তথা বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। নথি অনুযায়ী, স্থপতি টমাস লায়ন ১৭৭৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানিদের জন্য ভবনটির প্রাথমিক নকশা তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে এটি বাংলার প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গেও রাইটার্স বিল্ডিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ যোগ রয়েছে। স্থাপত্যের দিক থেকেও ভবনটির বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। নব্য-ধ্রুপদী স্থাপত্যশৈলী, বিশাল করিন্থিয়ান স্তম্ভ এবং পরবর্তী সময়ের ইন্দো-সারাসেনিক প্রভাব ভবনটির বৈশিষ্ট্যকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, মুখ্যসচিবের কাছে পাঠানো বার্তায় প্রস্তাবটি নিয়ে সরকারের দিকনির্দেশ এবং সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি এগোলে রাজ্য পূর্ত দফতরের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করে সরকারি নিয়ম ও নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, আপাতত রয়েছে প্রস্তাব এবং প্রাথমিক পরিদর্শন। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কারের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও হয়নি। ভবনটি সংস্কারে কী ধরনের মডেল নেওয়া হবে, আদানি গোষ্ঠীকে কীভাবে যুক্ত করা হবে এবং সংস্কারের কাজের পরিধি কতটা হবে—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখার পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


