লকডাউনে দুস্থদের কন্যাশ্রীর টাকাতে সাহায্য কলেজ ছাত্রী জাসমিনার, আরো সাহায্যে পাশে পরমব্রত

‍সাইফুদ্দিন মল্লিক : গ্রামের মানুষে পাশে ত্রান পৌঁছে দিচ্ছেন কলেজ ছাত্রী জাসমিনা খাতুন। মহামারী করোনা রুখতে লকডাউনে গরীব খেটে খাওয়া মানুষের করুন অবস্থা, কলকারখানা থেকে শুরু করে দৈনিক কাজ সমস্ত কিছুই বন্ধ। দুই মাস লকডাউনে খেটে  খাওয়া মানুষের অধিকাংশের বাড়িতে খাদ্যের সঙ্কট। এমনই খাদ্যের অভাবে দেখা দেয় হাওড়া জেলার উদয়নারায়নপুরে। তাদের খাদ্যের জোগান ও দেখাশোনা করছেন গ্রামের কলেজ ছাত্রী জেসমিনা খাতুন। নিজের কন্যাশ্রীর টাকা থেকে ওদের ত্রানের ব্যবস্থা করছেন।

হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর ব্লকের কুরচি শিবপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের টোকাপুর গ্রামের দীর্ঘ লকডাউনে কিছু পরিবারে খাদ্যের সঙ্কট তৈরি হয়। পাড়ার লোকেরা দুমুঠো খাবারের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। চোখের সামনে তা দেখে স্থির থাকতে পারেননি জেসমিনা। প্রাথমিক স্তরে নিজের চেষ্টাতে অল্প পরিবারের বাড়িতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। গ্রামের বিভন্ন বাড়িতে খোঁজ করে দেখেন কম বেশি বহু বাড়িতে খাদ্যের সঙ্কট। প্রশ্ন হলো টাকা পাবো কোথায়! ঠিক করলেন নিজের কন্যাশ্রীর টাকা তুলে সাহাজ্য করবেন, সেইমতো কাজ। তিনি আলু, পিঁয়াজ, ডাল, ডিম, সয়াবিন কিনে এনে লোকজন জুটিয়ে সেই খাদ্যসামগ্রী প্যাকেটবন্দি করে ফেলে জাসমিন। তারপর তা ৬০টি  দুস্থ পরিবারের হাতে তুলে দেন জাসমিন। ত্রান বিতরণে সময় দেখলেন কিছু পরিবারের বাকি থেকে যায়। তিনি তাদের নগদ টাকা বিতরণ করেন। তবে এই দান করার ক্যামেরাবন্দি নিজেও করেননি, কাউকে তা করতেও দেননি তিনি। রীনার কথায়, এটা ঠিক হত না।

৯০ থেকে ১০০ পরিবার মুখে নিয়মিত খাদ্য তুলে দেওয়া একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক সম্পর্কের দাদার মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট করেন ঘটনার বিবরণ দিয়ে। সেই পোস্ট চোখে পড়ে অভিনেতা পরমব্রত চ্যাটার্জীর।  গতকাল ২৫ মে নিজের ফেসবুক পেজে পরমব্রত বিষয়টি নিয়ে পোস্ট করেন। হাওড়া গ্রামীন পুলিশ ঘটনা সত্য বলে অভিনেতাকে জানালে, পুলিশের মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকা সাহাজ্য করেন অভিনেতা। উদয়নারায়ানপুর থানা সেই টাকা তুলে দেন জেসমিনার হাতে।

এইদিকে সোশ্যাল মিডিয়াতে খবর ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক কর্মী ও গবেষক সাগির  হোসেন আজকে জেসমিনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ( google pay নম্বর ) দ্বারা বিস্তারিত বিবরণে সহিদ পোস্ট করে সাহায্যের আবেদন করেন। উক্ত পোস্টে মুহূর্তের ভাইরাল হয়। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বহু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, জেসমিনার অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থ সাহায্য পাঠিয়েছেন। “আইমা” নামে এক সংগঠন ১০০টি দুস্থ পরিবারে ত্রান পাঠানোর অঙ্গিকার করেছেন।

উদয়নারায়ণপুর মাধবীলতা মহাবিদ্যালয়ের বিএ তৃতীয় বর্ষের এই ছাত্রী বছর কুড়ির  জাসমিনা খাতুন ( ডাকনাম রীনা)। গ্রামে রীনা বলে পরিচত কলেজ পড়ুয়া সোশ্যাল ওয়ার্কার জাসমিনা। ফোনে একান্ত আলাপচারিতাতে রীনা বলেন, ‘গ্রামের পূর্ব পাড়া, মল্লিকপাড়া, খাঁ পাড়া, হাজরাপাড়ার খেটে খাওয়া মানুষদের দুর্দশা লক্ষ্য করেছিলাম। মনে মনে স্থির করি যেভাবেই হোক মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সেজন্য কন্যাশ্রীর টাকাটাই খরচ করবো’। রীনা বলেন, আমার পক্ষে গরীবের পাশে দাঁড়ানো কাজটি বাড়ির প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করে করতে হয়েছে। কাজটি খুব সুচতুর ভাবে করা হয়েছে,  কারন বাড়ির লোক তাঁর সামাজিক কাজকে সাপোর্ট করে না বা পাশে ছিলেন না। কন্যাশ্রীর টাকা তুলে ত্রানের প্যাকেট তৈরিতে, বাড়িতে বলতে হয়েছিল ওটা বন্ধুদের সাহায্য। বাড়ির এক দিদি কিছুটা জানতো। উদয়নারায়নপুরের মার্বেল ব্যবসায়ীর সেখ শাহজামালের পাঁচ মেয়ের তিন নম্বর জাসমিনা খাতুন। মেয়ের কাজে এখন বাবা গর্বিত।

জাসমিনের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন উদয়নারায়ণপুর থানার ওসি মৌমোন চক্রবর্তী। তিনি বলেন, জাসমিন যদি কোনও ক্ষেত্রে আর্থিক সমস্যায় পড়েন, আমরা ওর পাশে থাকবো। কুরচি শিবপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান প্রদীপ মাটিও জাসমিনের প্রশংসা করেন। জাসমিনা এখন আইকন,  মানুষের অনুপ্রেরণাতে পরিনত হয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *