পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্রে এক গভীর বৈষম্যের ছবি ফুটে উঠেছে, যেখানে স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষকদের জন্য বেতন বৃদ্ধির ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হলেও, মাদ্রাসার কম্পিউটার শিক্ষকরা মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার যখন স্কুল শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রশিক্ষকদের বেতন বাড়িয়ে ১ জুলাই, ২০২৫ থেকে কার্যকর করার বড় বড় কথা বলছে, তখন মাদ্রাসার শিক্ষকদের দিকে তাকানোর সময়টুকুও তাদের নেই। এই দ্বিমুখী নীতি আর প্রতিশ্রুতির ফাঁকি শুধু শিক্ষকদের জীবনকে বিপর্যস্ত করছে না, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষার ভিত্তিকেও টলিয়ে দিচ্ছে।
স্কুলে কর্মরত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কম্পিউটার প্রশিক্ষক নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন, তাদের চুক্তি নবায়নের কোনো ঝক্কি নেই, এমনকি বেতন বৃদ্ধির সুবিধাও তাদের হাতে চলে আসছে। অন্যদিকে, মাদ্রাসার শিক্ষকদের কথা যেন সরকারের মাথাতেই নেই। ২০১৮ সালে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে ১৬৯ জন কম্পিউটার প্রশিক্ষক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন, যার সংখ্যা এখন ১৫৩-এ এসে ঠেকেছে। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একজন শিক্ষকের পক্ষে পরিবারের অন্ন সংস্থান করাও দায় হয়ে উঠেছে। দোকানদাররা বাকি দিতে রাজি নন, আর বেতনের অভাবে অনেকে বন্ধন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এর ফলে ঋণের বোঝা তাদের কাঁধে চেপে বসেছে, আর জীবন দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
গত ২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৬ মাস এই শিক্ষকরা বেতন পাননি। এরপর মাত্র চার মাস বেতন চালু হয়েছিল, কিন্তু তারপর আবার সেই একই অন্ধকার। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নিয়মিত ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছেন, কন্যাশ্রী, সবুজসাথী, ঐক্যশ্রী-র মতো সরকারি প্রকল্পের কাজ কম্পিউটারে সম্পন্ন করছেন। কিন্তু তাদের নিজেদের জীবন? সেটা যেন সরকারের কাছে কোনো বিষয়ই নয়। একজন শিক্ষককে ৩০ কিলোমিটার দূর থেকে মাদ্রাসায় আসতে হয়, মাসে ৩-৪ হাজার টাকা যাতায়াতে খরচ হয়। এই খরচের বোঝা তাদের সামান্য আয়ের তুলনায় অসহনীয়। তবুও তারা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু হতাশায় ভুগছেন এতটাই যে নিজের নাম প্রকাশ করতেও লজ্জা পাচ্ছেন।
তৃণমূল সরকারের এই উদাসীনতা আর দ্বৈত চরিত্র দেখে মনে হয়, তারা শুধু স্কুলের শিক্ষকদের জন্যই সরকার, মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য নয়। স্কুলের কম্পিউটার প্রশিক্ষকরা ২১ থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট সহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। আর মাদ্রাসার শিক্ষকরা? তাদের মাসিক ১০ হাজার টাকার সামান্য সাম্মানিকও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। বেতন বৃদ্ধি তো দূরের কথা, নিয়মিত বেতনের আশ্বাসও তাদের দেওয়া হচ্ছে না। মাদ্রাসা টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক আবু সুফিয়ান পাইক এই বৈষম্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, এই অবস্থায় অনেক শিক্ষক অনিয়মিতভাবে আসছেন, যারা আসছেন তারাও কাজে মন দিতে পারছেন না। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠনেও।
সরকারের পক্ষ থেকে ডিরেক্টর অব মাদ্রাসা এডুকেশন শান্তনু বসু জানিয়েছেন, বেতনের জন্য অর্থ বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু কবে সমাধান হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময় তিনি বলতে পারেননি। এই ‘কবে হবে, দেখা যাক’ ধরনের উত্তর শিক্ষকদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার কলকাতার মহাজাতি সদনে মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে এক কর্মশালায় শিক্ষকরা বেতন চালুর দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু দপ্তরের আধিকারিকদের কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। এই নীরবতা আর অবহেলা যেন তৃণমূল সরকারের চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি শুধু শিক্ষকদের প্রতি অবিচার নয়, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তৃণমূল সরকারের বড় বড় কথা আর প্রতিশ্রুতির ফাঁকি ধরা পড়ে গেছে। তারা যদি সত্যিই শিক্ষার উন্নয়ন চান, তাহলে মাদ্রাসার কম্পিউটার শিক্ষকদের বেতন সমস্যার সমাধানে তৎপর হওয়া উচিত। নইলে, এই বৈষম্য আর উদাসীনতা রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়ায় কুড়ুল মারবে। সরকারের কাছে প্রশ্ন, শুধু স্কুল কেন? মাদ্রাসার শিক্ষকরা কি এই রাজ্যের নাগরিক নন? তাদের প্রতি এই অবহেলা কি তৃণমূলের ‘সবার জন্য শিক্ষা’ স্লোগানের মুখে চপেটাঘাত নয়?


