পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দান ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বৃহস্পতিবার রাজ্যে একাধিক জনসভা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফের একবার অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানের বার্তা দেন। হলদিয়া, আসানসোল ও বীরভূমের সিউড়িতে তাঁর সভাগুলিতে এই বিষয়গুলিকেই সামনে রাখা হয়। একই দিনে রাজ্যে পৌঁছন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, যা স্পষ্ট করে দেয় যে আসন্ন নির্বাচনের আগে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব রাজ্যে সক্রিয় প্রচারে নেমেছে বাংলা ধকলে।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বারবার উঠে আসে ‘ঘুসপেটিয়া’ প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, সীমান্ত পেরিয়ে আসা মানুষদের জন্য রাজ্যের বাসিন্দারা কাজ হারাচ্ছেন এবং অন্য রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে বিরোধী রাজনৈতিক মহল ও অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বক্তব্য বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা। তাঁদের দাবি, রাজ্যে বেকারত্বের সমস্যা দীর্ঘদিনের, যার পেছনে কেন্দ্রীয় নীতিরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
অনুপ্রবেশকারীর নামে দাগিয়ে বীরভূমের সোনালী বিবির ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বহু মানুষ। পাইকর গ্রামের সোনালি বিবির কাহিনি সেই যন্ত্রণারই প্রতিফলন। বিজেপি শাসিত রাজ্যে শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিযোগ তুলে, গর্ভাবস্থাতেই ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে জোর করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয় এবং সঠিক পরিচয়পত্র দেখানোর সত্বেও তাদের আটক করে রাখা হয়েছিল। অসহায় ও দরিদ্র এই পরিবারের উপর কী পরিস্থিতি নেমে এসেছিল, সেই খবর এখন রাজ্যজুড়ে প্রায় সবার জানা। বলে রাখা ভালো, সোনালী বিবির স্বামী এখনো ওপর বাংলায় আটক। এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ‘বহিরাগত’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত।
সমালোচকদের একাংশ বলছেন, কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ তুললেও প্রধানমন্ত্রী তাঁর আগের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও ব্যাখ্যা দেননি। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক চাকরি তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে সেই হারে কর্মসংস্থান হয়নি বলে অভিযোগ। ফলে নতুন করে ‘রোজগার মেলা’ বা চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বীরভূমের সিউড়ির সভায় প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কিছু ঘটনার উল্লেখ করে রাজ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে বিরোধীদের বক্তব্য, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামনে এনে পুরো রাজ্যের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির চেষ্টা চলছে বিজেপি। তাঁদের মতে, এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটের আগে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপি এই মুহূর্তে দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে—একদিকে ধর্মীয় ও সীমান্ত ইস্যু তুলে ধরে আবেগে প্রভাব ফেলা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও দুর্নীতির প্রশ্ন তুলে কেন্দ্র সরকারের বছরে দুই কোটি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি খেলাফ। তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে সাধারণ ভোটারদের উপর।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করেছে—নির্বাচনের আগে বিজেপি রাজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বিরোধীদের পাল্টা অভিযোগ ও বাস্তব পরিস্থিতির প্রশ্ন মিলিয়ে এই লড়াই যে সহজ হবে না, তা বলাই যায়।


