বীরভূমের মুরারইয়ের পাইকর গ্রামের বাসিন্দা সোনালি বিবির চোখে জল আজও থামেনি। কোলে তিন মাসের শিশুপুত্র, পাশে আরও দুই সন্তান—এই অবস্থায় স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আর্তি জানাচ্ছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, তাঁর স্বামী দানিশ শেখ এখনও বাংলাদেশে আটকে রয়েছেন, অথচ তিনি নিজে অনেক কষ্টে দেশে ফিরতে পেরেছেন।
সোনালি জানালেন, কাজের খোঁজে কয়েক বছর আগে তিনি ও তাঁর স্বামী দিল্লিতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁদের বড় ছেলে এবং একই গ্রামের আরও একটি পরিবার। সেখানে দিনমজুরির কাজ করেই কোনওরকমে সংসার চলত। কিন্তু হঠাৎ এক রাতে সবকিছু বদলে যায়। অভিযোগ, বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে সন্দেহ তৈরি হয়, এবং পুলিশ তাঁদের আটক করে। সমস্ত পরিচয়পত্র দেখানো সত্ত্বেও তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁদের অসম সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সোনালির কথায়, সেই সময় তাঁরা একেবারে অসহায় অবস্থায় পড়েন। ঠিকমতো খাবার বা আশ্রয় কিছুই ছিল না। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় কয়েকদিনের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই পান। কিন্তু সেখানেও বিপদ কাটেনি। বাংলাদেশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তাঁদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে জেলে পাঠানো হয়।
এই সময় সোনালি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাঁর পরিবার ভারতে আইনি লড়াই শুরু করে। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন। তবে তাঁর স্বামী এবং গ্রামের আরও কয়েকজন এখনও ফেরেননি। তাঁদের অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যাচ্ছে না বলে দাবি পরিবারের।
বর্তমানে সোনালি তাঁর বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ছোট একটি ঘরে বহু মানুষ একসঙ্গে থাকছেন। সংসারে রোজগারের একমাত্র ভরসা তাঁর দাদা, যিনি টোটো চালান। সীমিত আয়ে এত বড় পরিবারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারটির অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত। প্রয়োজনীয় নথি থাকা সত্ত্বেও রেশন, ভাতা বা আবাসন—কোনোটাই ঠিকমতো পাননি।
গ্রামের বাসিন্দাদের একাংশেরও একই অভিযোগ—বারবার আবেদন জানানো হলেও তেমন সাড়া মেলেনি। ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা বদল হয়নি বলে তাঁদের দাবি। এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ভুল হলে তার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।
এদিকে শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে যাঁরা এখনও দেশে ফিরতে পারেননি, তাঁদের নিরাপদে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সে দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।


