দেশের মানুষকে জ্বালানি সাশ্রয়, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো এবং গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রান্নার তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংযমের বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আহ্বানের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর বিস্তৃত সফরসূচি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন প্রকাশ্য তথ্য ও সরকারি বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে করা এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর ১ মার্চ থেকে ১২ মে পর্যন্ত মাত্র ৭০ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী দিল্লির বাইরে মোট ৮১টি জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে অংশ নেন। এই সময় তিনি ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে ৫৩টি শহর ও জনপদ সফর করেন।
তথ্য অনুযায়ী, ওই ৮১টি কর্মসূচির মধ্যে মাত্র ১৩টি সরাসরি সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্প উদ্বোধন বা শিলান্যাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাকি অধিকাংশ কর্মসূচি ছিল রাজনৈতিক সভা, রোড শো বা নির্বাচনী প্রচারের অংশ।
বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরির নির্বাচনী প্রচারেই সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেছেন প্রধানমন্ত্রী। মোট ৮১টি কর্মসূচির মধ্যে ৫৩টিই হয়েছিল এই পাঁচ অঞ্চলে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ২৬টি, অসমে ১১টি, কেরলে ৮টি, তামিলনাড়ুতে ৬টি এবং পুদুচেরিতে ২টি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
এই সময়কালে প্রধানমন্ত্রী ৩৭টি জনসভা, ২৫টি রোড শো এবং ১৩টি উদ্বোধন বা শিলান্যাস অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতেও উপস্থিত ছিলেন তিনি।
বিশেষভাবে নজর কেড়েছে একাধিক দীর্ঘ রোড শো। এপ্রিল মাসে শিলিগুড়িতে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রোড শো করেন প্রধানমন্ত্রী। ঝাড়গ্রাম এবং কলকাতাতেও বৃহৎ রোড শো অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিপুল সংখ্যক যানবাহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছিল।
সমালোচকদের প্রশ্ন, যখন সাধারণ মানুষকে জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হচ্ছে, তখন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এত ব্যাপক ভ্রমণ ও জনসমাগম নির্ভর কর্মসূচির যৌক্তিকতা কতটা।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর গুজরাত সফরও। ১০ মে, যেদিন তিনি দেশবাসীকে জ্বালানি সাশ্রয়ের বার্তা দেন, সেদিনই সেকেন্দ্রাবাদ ও জামনগরে দুটি রোড শো করেন। পরদিন সোমনাথে আরও একটি রোড শোতে অংশ নেন এবং মন্দিরে উপস্থিত থাকাকালীন ভারতীয় বায়ুসেনার সূর্যকিরণ অ্যারোবেটিক দলের বিশেষ প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে, জ্বালানি সাশ্রয়ের বার্তার পর সরকারি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক নীতি আয়োগ বিভিন্ন সশরীরে অনুষ্ঠানে কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভার্চুয়াল বৈঠকের উপর জোর দেয়। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কনভয়ের আকারও কমানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিস্তৃত সফরসূচির একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। অন্যদিকে সরকারপন্থী মহলের যুক্তি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন রাজ্যে সফর করা প্রয়োজনীয় এবং তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।
এই বিতর্কের মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের বার্তা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সমাজে।


