ভারতের আধুনিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে যে ক’জন বিজ্ঞানী গভীর ছাপ রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে ওবায়েদ সিদ্দিকির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক স্তরে খ্যাতি ও সুযোগের অভাব ছিল না তাঁর। তবু সব কিছু ছেড়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন সদ্য স্বাধীন এক দেশের বিজ্ঞানচর্চাকে গড়ে তুলতে। এই সিদ্ধান্তই ভারতের জেনেটিক্স ও মলিকিউলার বায়োলজির গতিপথ বদলে দেয়।
কর্মজীবনের শুরুতে সিদ্দিকি ছিলেন একজন উদ্ভিদবিদ। ভারতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তিনি রোগপ্রতিরোধী গমের জাত উন্নয়নের কাজ করছিলেন। কিন্তু এক ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর এক বছরের পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই সময় বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথনের পরামর্শে তিনি জেনেটিক্সের দিকে মন দেন, যে বিষয়টি তখন ভারতে প্রায় অনুপস্থিতই ছিল বলা যেতে পারে।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যান স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অধ্যাপক গুইডো পন্তেকরভোর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরে আমেরিকায় গিয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণায় যুক্ত হন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যালান গ্যারেনের সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি ‘ননসেন্স কোডন’ আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন, যা জেনেটিক কোড বোঝার ক্ষেত্রে এক বড় মাইলফলক ছিল।
তাঁর কাজের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী লিও সিজিলার্ড পর্যন্ত হোমি জে ভাভাকে চিঠি লিখে এই তরুণ ভারতীয় গবেষকের প্রশংসা করেন। ঠিক সেই সময়েই ভাভার আহ্বানে ১৯৬২ সালে সিদ্দিকি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে তিনি দেশের প্রথম মলিকিউলার বায়োলজি ইউনিট গড়ে তোলেন। এটি শুধু একটি বিভাগ ছিল না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য এক শক্ত ভিত। তাঁর সোজাসাপ্টা বক্তব্য ও কঠোর মানদণ্ডের কথা আজও বহু সহকর্মী স্মরণ করেন।
সত্তরের দশকে তিনি নিউরোজেনেটিক্সে কাজ শুরু করেন। ফলমাছি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি দেখান, কীভাবে জিন স্নায়ু ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাদ ও গন্ধ সংক্রান্ত জিনগত পথের আবিষ্কার আন্তর্জাতিক গবেষণায় নতুন দিশা দেয়।
বিজ্ঞানী হিসেবে কঠোর হলেও ব্যক্তিগত জীবনে সিদ্দিকি ছিলেন শিল্পমনস্ক। সরোদ বাজাতেন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভালোবাসতেন, পড়তেন ফার্সি ও আরবি কবিতা।
রয়্যাল সোসাইটি ও মার্কিন ন্যাশনাল অ্যাকাডেমির সদস্যপদ, পদ্মবিভূষণ, সব সম্মান পেয়েও তিনি আজীবন তরুণ গবেষকদের পাশে থেকেছেন। বিদেশে থেকে গেলে সহজ জীবন সম্ভব ছিল, কিন্তু তিনি দেশেই থেকে ভারতের জীববিজ্ঞানের ভিত মজবুত করে গেছেন। তাই ওবায়েদ সিদ্দিকিকে শুধু একজন বিজ্ঞানী নয়, ভারতের জৈব গবেষণার স্থপতি হিসেবেই মনে রাখা হয়।


