মুর্শিদাবাদের রানিনগর বিধানসভা এলাকার এক প্রান্তে রয়েছে পদ্মা নদীর চরভূমি—যেখানে মাটি যেমন অনিশ্চিত, তেমনই অনিশ্চয়তায় ভরা মানুষের জীবন। বুধুরপুর পর্যন্ত জমি শক্ত থাকলেও, তার পরেই শুরু হয় বালিময় চর। নদীর খেয়ালখুশিতে এখানে বদলে যায় জমির চেহারা, ঘরবাড়ির অবস্থান, এমনকি মানুষের ভবিষ্যৎও। এই অঞ্চলের বহু পরিবারেই কেউ না কেউ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যে কাজ করেন, সেখান থেকে টাকা পাঠিয়েই সংসার চলে।
এই চরভূমিরই একটি গ্রামে পাশাপাশি বাড়ি প্রফুল্ল দাস ও কামিদুল হোসেনের। বহু বছর ধরে দুই পরিবারের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত ভোটার তালিকা যেন সেই সম্পর্কেই অদৃশ্য বিভাজন তৈরি করেছে। প্রফুল্ল দাসের পরিবারের নাম তালিকায় ঠিক থাকলেও, কামিদুল হোসেনের পরিবারের সব সদস্যের নামের পাশে লেখা হয়েছে “বিচারাধীন”।
প্রফুল্ল দাস নিজেও এই পরিস্থিতিতে অস্বস্তিতে। তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ার ফলে প্রতিবেশীদের সামনে দাঁড়াতে লজ্জা লাগছে। যাদের সঙ্গে এতদিন একসঙ্গে বসবাস করেছেন, বিপদে পাশে পেয়েছেন, আজ তাদের নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনা একা নয়। রানিনগর এলাকায় প্রায় ২ লক্ষ ৬১ হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় ৯২ হাজারের বেশি নাম “বিচারাধীনের আওতায়” রাখা হয়েছে, যা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সদস্যরা বাইরে কাজ করেন, তাদের মধ্যেই এই অনিশ্চয়তা বেশি দেখা যাচ্ছে।
এলাকার বিভিন্ন বুথ ঘুরে দেখা যাচ্ছে, এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। হিন্দু অধ্যুষিত বুথগুলিতে খুব কম সংখ্যক ভোটারের নাম যাচাইয়ের তালিকায় রয়েছে। সেখানে এই হার ৩ শতাংশেরও কম। কিন্তু পাশের মুসলিম অধ্যুষিত বুথগুলিতে এই সংখ্যা হঠাৎ করেই অনেক বেশি—কোথাও ৩৫ শতাংশ, কোথাও আবার প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
রানিনগরের পদ্মা চর অঞ্চলে মোট ১৭টি বুথ রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি হিন্দু প্রধান এবং ৫টি মুসলিম প্রধান। দেখা যাচ্ছে, হিন্দু অধ্যুষিত বুথগুলিতে যেখানে ৮ থেকে ১০ শতাংশ নাম যাচাইয়ে রয়েছে, সেখানে মুসলিম অধ্যুষিত বুথগুলিতে এই হার ৪৫ থেকে ৫৭ শতাংশের মধ্যে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের দেওয়া তথ্য বলছে, খুব অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রেই পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ যাদের নাম এখন যাচাইয়ের তালিকায়, তাদের অধিকাংশেরই আগের নথিতে উপস্থিতি রয়েছে।
যাদের ডেকে পাঠানো হয়েছে শুনানির জন্য, তাদের অভিজ্ঞতাও কম বিচিত্র নয়। কেউ প্রশ্নের মুখে পড়েছেন পরিবারের সদস্যসংখ্যা নিয়ে, কেউ বা নামের বানান নিয়ে। অনেকেই মনে করছেন, তাদের সাধারণ ভোটার হিসেবে নয়, বরং সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্রামের মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে উদ্বেগ। অনেকে বলছেন, এতদিন একসঙ্গে শান্তিতে থাকা সত্ত্বেও এখন অকারণে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। এক প্রবীণ বাসিন্দার কথায়, এত মানুষের নাম বাদ পড়লেও কেন শুধুমাত্র একটি সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন, সেটাই ভাবাচ্ছে।
রানিনগরের এই পরিস্থিতি মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলির বড় একটি বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন। এখানে বহুদিন ধরেই অভিবাসন, নথির ঘাটতি ও সীমান্তবর্তী অবস্থান মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট। কেউ বলছেন এটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আবার কেউ অভিযোগ তুলছেন পরিকল্পিতভাবে কিছু মানুষকে চাপে ফেলার চেষ্টা চলছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এই বিতর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা।


