বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্ব। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মতো উত্তর কলকাতার তৃণমূল সংগঠনেও দলীয় কোন্দল এবার সামনে চলে এল। দলের উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়-কে লক্ষ্য করে দলীয় হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিলেন এক কাউন্সিলর। পরে সেই কথোপকথনের স্ক্রিনশট সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। কলকাতাতেও দলের বহু নেতা পরাজিত হয়েছেন। অভিযোগ, ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বহু নেতা-কর্মী ঘরছাড়া এবং আতঙ্কে রয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটেই উত্তর কলকাতা জেলা তৃণমূলের ‘অফিসিয়াল’ হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপে সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
গ্রুপে সাংসদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, উত্তর কলকাতার ‘অঘোষিত সম্রাট’ হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল ঘরছাড়া নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু অভিযোগ, তিনি নিজেই দীর্ঘদিন পদ আঁকড়ে বসে রয়েছেন। এই মন্তব্য সামনে আসতেই সুদীপ-ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলরদের একাংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুনন্দা সরকার পাল্টা প্রশ্ন তোলেন স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে। কথোপকথনের মধ্যেই দলের প্রাক্তন মন্ত্রী শশী পাঁজা-র প্রসঙ্গও উঠে আসে। তর্ক-বিতর্ক দ্রুত ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিজেই গ্রুপে মন্তব্য করেন সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লেখেন, “হাতি চলে বাজার, কুত্তা ভোকে হাজার”—যা নিয়ে আরও বিতর্ক তৈরি হয়। এর জবাবে কাউন্সিলর সুব্রত জানান, তিনি দলের সৈনিক, কোনও অপমানজনক অভিধায় তাঁকে ডাকা উচিত নয়।
এই হোয়াট্সঅ্যাপ চ্যাট ফাঁস হয়ে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি বেড়েছে। যদিও প্রকাশ্যে অধিকাংশ নেতা মন্তব্য করতে চাননি। কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ তথা উত্তর কলকাতা জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির সদস্য স্বপন সমাদ্দার বলেন, দলীয় মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক কথোপকথনে শালীন ভাষা ব্যবহার করা উচিত।
রাজনৈতিক মহলের মতে, উত্তর কলকাতায় সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে ক্ষোভ নতুন নয়। এর আগেও বেলেঘাটার জয়ী নেতা কুণাল ঘোষ-এর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছিল। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সেই অন্তঃকলহ আবার সামনে আসছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন এবং এ বার প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। ইতিমধ্যে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়-এর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়-কে বিধানসভায় উপদলনেতা করা নিয়েও দলের একাংশে অসন্তোষ রয়েছে বলে সূত্রের খবর।
দলীয় সূত্রের মতে, নির্বাচনী ফলের ধাক্কার পর সংগঠনের ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে তৃণমূল নেতৃত্বের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


