কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যখন দেশজুড়ে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ এবং ‘উন্নত ভারতের’ ঢ্যড়া পিটিয়ে চলেছে, ঠিক তখনই ছত্তীসগঢ়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সামনে এল এক হাড়হিম করা ও অমানবিক বাস্তব। বয়স নব্বই পেরিয়েছে, প্রতিবন্দী বৃদ্ধা শাশুড়ির সামান্য সরকারি পেনশনের টাকা তুলতে প্রখর রোদের মধ্যে তাঁকে পিঠে কাপড়ে বেঁধে টানা নয় কিলোমিটার পাহাড়ি ও জঙ্গল ঘেরা রাস্তা পায়ে হেঁটে ব্যাঙ্কে নিয়ে যাচ্ছেন এক গৃহবধূ। সমাজমাধ্যমে এই মর্মস্পর্শী ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিজেপির তথাকথিত ‘সুশাসন’ এবং গরিব কল্যাণের বড় বড় বিজ্ঞাপনী ফাঁকা আওয়াজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছত্তীসগঢ়ের সুরগুজা জেলার মৈনপট অঞ্চলের এই ঘটনাই এখন দেশের আসল কঙ্কালসার চেহারাটা আম জনতার সামনে এনে দিয়েছে।
জানা গেছে, ওই মহিলার নাম সুখমানিয়া বাই। তিনি প্রতি মাসে নিজের প্রতিবন্দী বৃদ্ধা শাশুড়িকে পিঠে বেঁধে ঘন জঙ্গল, পাথুরে রাস্তা এবং নদী পার হয়ে দীর্ঘ ৯ কিলোমিটার পথ হেঁটে ব্যাঙ্কে পৌঁছন। আর এই অমানুষিক কষ্টের কারণ হলো কেন্দ্রের তৈরি করা এক নির্মম ডিজিটাল নিয়ম। ব্যাঙ্কের আধিকারিকদের বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনো লাভ হয়নি, কারণ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পেনশন পেতে হলে উপভোক্তাকে সশরীরে ব্যাঙ্কে উপস্থিত হয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ দিয়ে বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন করাতেই হবে। বৃদ্ধা হাঁটতে না পারলেও এই যান্ত্রিক নিয়মের জেরে ব্যাঙ্কের ঘরে তাঁকে উপস্থিত করতেই হয়, অন্যথায় আটকে যায় বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বলটুকু। মাসের পর মাস ধরে এই নির্মম লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে এই পরিবারটিকে।
সুখমানিয়া বাই ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানিয়েছেন যে, তাঁদের এলাকায় ন্যূনতম কোনো গণপরিবহন ব্যবস্থাটুকু পর্যন্ত নেই। এত বড় ঝুঁকি আর অমানুষিক কষ্টের পর ওই বৃদ্ধা প্রতি মাসে পেনশন বাবদ পান মাত্র ১৫০০ টাকা। কিন্তু চরম আশ্চর্যের বিষয় হলো, অধিকাংশ মাসেই সেই সামান্য টাকাটুকুও ঠিকমতো মেলে না। মাসের পর মাস ঘোরানোর পর দুই-তিন মাসের টাকা একসঙ্গে দেওয়া হয়। ওই মহিলার অভিযোগ, আগে এই পেনশনের টাকা স্থানীয় স্তরেই উপভোক্তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমান জমানায় ‘ডিজিটাল’ ও ‘ব্যাঙ্কিং’ ব্যবস্থার বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে সেই প্রাচীন ও সহজ নিয়ম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জঙ্গল ঘেরা এই পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতের জন্য পায়ে হাঁটা ছাড়া কোনো বিকল্প না থাকায়, গরিব মানুষকে এভাবে ভিখারির মতো হেনস্থা হতে হচ্ছে। কর্পোরেটদের লাখ কোটি টাকার ঋণ মকুব করে দেওয়া মোদী সরকারের এই উদাসীনতা ও গরিব-বিরোধী নীতির বিরুদ্ধেই এখন সরব হয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ।


