Saturday, September 5, 2026
30 C
Kolkata

তৃণমূলের বিজয় মিছিলে শিশুর মৃত্যু: গণতন্ত্রের উৎসবের নামে তৃনমূলের পৈশাচিকতার নগ্ন রূপ দেখলো রাজ্যবাসী

পশ্চিমবঙ্গের কালীগঞ্জে উপনির্বাচনের গণনা শেষ হওয়ার আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু সেই উৎসবের মাঝে এক নৃশংস ঘটনায় প্রাণ হারায় ১০ বছরের তামান্না খাতুন, যার নামের অর্থ ‘আশা’, কিন্তু হায় সে আশা রাজনীতির বর্বর খেলায় চিরতরে মুছে গেল। তৃণমূলের বিজয় মিছিল থেকে ছোঁড়া শকেট বোমায় বীভৎস রকমের আহত হয়ে বাড়ির উঠোনে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে এই শিশুকন্যা। তার মা সাকিনা বিবি মেয়ের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন, আর সেই কান্না যেন গোটা সমাজের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। এটি কি সেই শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্র, যার কথা আমরা বারবার শুনে এসেছি?

ঘটনাটি ঘটেছে গত সোমবার, কালীগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের পলাশির মোলান্দি গ্রামে। তখনও গণনার ২৩টি রাউন্ড শেষ হয়নি, কিন্তু জয়ের আভাস পেয়েই তৃণমূলের কর্মীরা মমতা ব্যানার্জি ও অভিষেক ব্যানার্জির ছবি হাতে সশস্ত্র মিছিল শুরু করে। সবুজ আবিরে মেতে ওঠা সেই মিছিল গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় সিপিআই (এম) সমর্থক পরিবারগুলোকে টার্গেট করে বোমা ছুঁড়তে থাকে। তামান্নার বাড়িও ছিল সেই লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে। স্নান করতে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরোনোর সময় একটি শকেট বোমা তার গায়ে লাগে। বোমার বিস্ফোরণের মারাত্মক তীব্রতায় তার গলার মাংস খুবলে ছড়িয়ে পড়ে, আর মুহূর্তের মধ্যে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তৃনমূলের এই নৃশংস বিজয়োল্লাসের বলি হতে হলো এই নিষ্পাপ চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তামান্নাকে।

তামান্নার পরিবার গরিব ও অসহায়। তার বাবা হোসেন শেখ সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে লোহাভাঙা, কাঁচভাঙ্গা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাওড়ায় কাজ করা এই মানুষটি ভোটের আগের দিন বাড়ি ফিরেছিলেন, ভোট দিয়ে আবার কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের একমাত্র কন্যা তামান্নাই ছিল পরিবারের সব স্বপ্ন আর আশার আলো। নামটিও তাই রাখা হয়েছিল ‘তামান্না’—যার মানে ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তৃণমূলের প্রতিহিংসাপরায়ণ গুন্ডামির কাছে সেই আশা চিরতরে হারিয়ে গেল। ঘটনার সময় মা সাকিনা বিবি ঘরে ছিলেন, আর তামান্না সবে স্নানের জন্য বাইরে পা রেখেছিল। কিন্তু তৃণমূলের উন্মত্ত কর্মীদের হাত থেকে ছোঁড়া বোমা তার জীবন কেড়ে নিল।

এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং তৃণমূলের ফ্যাসিস্ট রাজনীতির একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। নির্বাচনী বিধি তখনও জারি থাকা সত্ত্বেও তারা সশস্ত্র মিছিল বের করে, বিরোধী সমর্থকদের বাড়িতে বোমা ছোঁড়ে। এই পৈশাচিকতা কেবল তামান্নার পরিবারের ওপর নয়, গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর একটি আঘাত। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা আর শান্তি-সম্প্রীতির পরিবেশ যে তৃণমূলের হাতেই সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছে, তা এই ঘটনায় আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল। নির্বাচন কমিশনও এই দায় এড়াতে পারে না, কারণ তাদের নীরবতা আর নিষ্ক্রিয়তাই তৃণমূলের এই গুন্ডামিকে উৎসাহ দিচ্ছে।

রাজনৈতিক মহল থেকেও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা হয়েছে। সিপিআই (এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, “এটি তৃণমূলের নৃশংসতার একটি নমুনা। গণনা চলাকালীনই তারা বিজয় মিছিল শুরু করে, আর সেই মিছিল থেকে বোমা ছুঁড়ে একটি নিরীহ শিশুর প্রাণ কেড়ে নেয়।” প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও কড়া ভাষায় সমালোচনা করে বলেছেন, “একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া বিজয় মিছিলের জন্য বিজয়ী প্রার্থীর শংসাপত্র বাতিল করা উচিত।” গ্রামবাসীরাও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা শেখ বলেন, “তৃণমূলের ব্লক সভাপতির নির্দেশেই এই বোমাবাজি হয়েছে। সিপিআই (এম) সমর্থকদের বাড়ি টার্গেট করে তারা এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে।”

তৃণমূলের এই নৃশংসতা আর প্রতিহিংসার রাজনীতি শুধু একটি পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দেয়নি, বরং গোটা সমাজের কাছে একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—এই ধরনের গুন্ডামি আর ফ্যাসিস্ট আচরণ কি আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ? তামান্নার মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতীক খুন নয়, এটি জনগনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রজনৈতিক দলগুলির রাজনৈতীক ভবিষ্যৎ। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে, আর আমাদের গণতন্ত্রের মুখে কালি পড়তে থাকবে। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে সবাইকে একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে, যাতে তামান্নার মতো আর কোনও নিষ্পাপ প্রাণ এভাবে হারিয়ে না যায়।

Hot this week

অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল হয়েও ১ বছরে মিলেছে ১৫০০ কোটি টাকার অনুদান! সবকটির সদর দপ্তর গুজরাটে

গুজরাটে সদর দপ্তর থাকা ৬ নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক...

ভূমধ্যসাগরে মাইক্রোঅ্যালগির দাপট! ইজরায়েলের অধিকাংশ ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট বন্ধ, জলসংকটের আশঙ্কা

ভূমধ্যসাগরে হঠাৎ করে বেড়ে ওঠা মাইক্রোঅ্যালগির কারণে বড়সড় সমস্যায়...

গাঁজা সেবনের অভিযোগে ফুকেত-দিল্লি ফ্লাইটের সেই পাইলটকে এবার বরখাস্ত করল এয়ার ইন্ডিয়া!

ফুকেত থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে বিপদের মুখে পড়া এয়ার...

Topics

অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল হয়েও ১ বছরে মিলেছে ১৫০০ কোটি টাকার অনুদান! সবকটির সদর দপ্তর গুজরাটে

গুজরাটে সদর দপ্তর থাকা ৬ নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক...

Related Articles

Popular Categories