গত ২৩ জুন, ২০২৫, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের ভোট গণনা চলাকালীনই তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা “বিজয়” উদ্যাপনের নামে যে সশস্ত্র মিছিল বের করে, তা শেষ হয় এক শিশুর রক্তাক্ত লাশে। ১০ বছরের তমন্না খাতুন (চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী) তৃণমূলের মিছিল থেকে ছোঁড়া শকেট বোমার বিস্ফোরণে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ডই নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার আবর্জনার স্তূপে পরিণত হবার জ্বলন্ত উদাহরণ।
পলাশির মোলান্দি গ্রামে (কালীগঞ্জ থানা এলাকা) ভোট গণনার ২৩ রাউন্ডের মধ্যে মাত্র কয়েকটি রাউন্ড শেষ হতেই তৃণমূল কর্মীরা সবুজ পতাকা ও ব্যানার নিয়ে বিজয় মিছিল শুরু করে। মিছিল চলাকালে সিপিআই(এম) সমর্থক পরিবারের বাড়িগুলোকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়। তমন্না বাড়ির উঠানে স্নান করতে বেরোনোর সময় বোমার স্প্লিন্টারে তার গলা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় । তমন্নার মা সাকিনা বিবি অভিযোগ করেন, “আমরা তৃণমূলকে ভোট দিইনি, তাই আমাদের লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে”। পরিবারটি দারিদ্র্যপীড়িত—বাবা হোসেন শেখ বাড়ি বাড়ি ঘুরে লোহা, টিন, কাঁচ, প্লাস্টিকজাত ভাঙা জিনিষ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন ।
মোলান্দি গ্রামটি বড়চাঁদঘর পঞ্চায়েত-এর অধীনস্থ। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই গ্রামের ৫টি আসনে ফলাফল ছিল: তৃণমূল: ২টি আসন, সিপিআই(এম): ২টি আসন, বিজেপি: ১টি আসন ।
বড়চাঁদঘর পঞ্চায়েত সমিতির ৩টি আসনের মধ্যে ২টিতে তৃণমূল জয়ী হলেও স্থানীয় স্তরে সিপিআই(এম)-এর শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটে পরাজয়ের প্রতিশোধ ও বিরোধী শিবিরকে ভীতসন্ত্রস্ত করাই এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল।
সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম একে “নৃশংসতার নমুনা” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “গণনা চলাকালীন মিছিল বের করাই নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন, আর তাতে শিশুহত্যা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সামিল”। বিজেপি নেতা অমিত মালব্য টুইটারে লেখেন, “তৃণমূলের বিজয়োল্লাস রক্তে রাঙা…এরা শকুনের দল” ।
তৃণমূলের দলীয় নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার পাল্টা দাবি করেন, “বিজেপিই পেছন থেকে বোমা ছুড়েছে আমাদের মিছিলে” ।
নির্বাচন কমিশন ভোট গণনার সময় মিছিল হতে দেওয়ায় এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ প্রথমে “দুষ্কৃতীদের ঘটনা” বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও স্থানীয় জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়ে পরে একে একে চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় শিশু মৃত্যুর রেকর্ড গড়ছে পশ্চিমবঙ্গ। সরকারী তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সাল থেকে নির্বাচন-সম্পর্কিত হামলায় ১৪টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইটে “মর্মাহত” লিখে প্রকাশ করলেও, তাঁর দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ।
তমন্না যার নামের অর্থ ‘আশা’ সেই আশার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে নয়, গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শোকাতুর করেছে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের আগেই বিজয় মিছিল এবং সিপিআইএমের সমর্থকদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাস প্রমাণ করে যে কালীগঞ্জে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মানবিকতাকে বলি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে মোলান্দির ভোটবিভাজনই দেখিয়েছিল যে এই এলাকার মানুষ রাজনৈতিকএকনায়কতন্ত্র মানতে নারাজ—আর তৃণমূলের এই হামলা সেই স্বাধীন চেতনাকেই দমন করার প্রয়াস ।

