ঐতিহ্যবাহী আলিপুর চিড়িয়াখানা, যেটি একসময় কলকাতার গর্বের প্রতীক ছিল, আজ তৃণমুল কংগ্রেস সরকারের চরম অযোগ্যতা ও দুর্নীতির শিকার হয়ে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে। একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, এই সরকারের নাকের ডগায় কীভাবে প্রাণী নিখোঁজ হচ্ছে, জমি বিক্রির ষড়যন্ত্র চলছে, আর তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। শহরভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বজন’ কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করে যে তথ্য তুলে ধরেছে, তা শুধু লজ্জাজনক নয়, রীতিমতো রক্ত গরম করা। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের শেষে চিড়িয়াখানায় প্রাণীর সংখ্যা ছিল ৬৭২টি, কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শুরুতেই তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫১-এ। মানে, এক বছরের মধ্যে ৩২১টি প্রাণী গায়েব! এ কী অলৌকিক ঘটনা, না কি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা কোনো গভীর ষড়যন্ত্র?
চিড়িয়াখানার অধিকর্তা অরুণ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য শুনলে হাসি পায়, আবার রাগও হয়। তিনি বলেছেন, “ওই বিষয়টিতে আমাদের কাজ চলছে। পরে বিস্তারিত বলা যাবে।” এত বড় ঘটনার পর এমন গোলমেলে উত্তর কি জনগণকে বোকা বানানোর চেষ্টা নয়? আরও চিন্তার বিষয়, ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের ইনভেন্টরি রিপোর্টও জমা পড়েনি, যা বাধ্যতামূলক। এই অস্বচ্ছতার পেছনে রাজ্য সরকারের নিষ্ক্রিয়তা আর দুর্নীতির গন্ধ স্পষ্ট।

একদিকে প্রাণী উধাও, অন্যদিকে জমি বিক্রির অভিযোগে কলকাতার মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। এনজিও-র দাবি, আলিপুর চিড়িয়াখানার ৩৪এ, বেলভেডিয়ার রোডের প্রায় ৩ একর জমি বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। এই জমিতে রয়েছে ভেটেরিনারি হাসপাতাল, রেসকিউ সেন্টার, পাবলিক অ্যাকোয়ারিয়াম—যেগুলো চিড়িয়াখানার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও এই অভিযোগ তুলে বলেছেন, অডিটোরিয়াম ও স্টাফ কোয়ার্টারের অবস্থা খারাপ হলেও, এই জমি বাণিজ্যিক কাজে লাগানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও টেন্ডার ডাকা হয়েছে—এটা কি আইনের প্রতি রাজ্য সরকারের চরম অবমাননা নয়?

কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে, বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চ দ্রুত শুনানির নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ২৪ জুলাই পরবর্তী শুনানি। এনজিও-র দাবি, গত ১০ বছরের ইনভেন্টরি রিপোর্ট জমা দিতে এবং প্রতিটি গরমিলের জবাব দিতে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হোক। কিন্তু তৃণমুল সরকারের অধীনে এই কর্তৃপক্ষ কতটা স্বচ্ছতা দেখাবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। এই সরকার যে শুধু চিড়িয়াখানার প্রতি উদাসীন, তা নয়—পুরো রাজ্যের প্রতিই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। প্রাণী নিখোঁজের ঘটনা আর জমি বিক্রির ষড়যন্ত্র—এসব তৃণমুলের শাসনকালে দুর্নীতি আর অপরাধের নগ্ন চিত্র।

একসময় দেশের ১৫৭টি স্বীকৃত চিড়িয়াখানার মধ্যে ‘লার্জ জু’ হিসেবে গণ্য আলিপুর চিড়িয়াখানা আজ প্রাণী কমে ‘মিডিয়াম সাইজ জু’-তে পরিণত হয়েছে। এই অবনতির জন্য রাজ্য সরকারের অবহেলা আর দুর্নীতিই দায়ী। তারা এই ঘটনার গভীর তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই নিষ্ক্রিয়তা আর দুর্নীতির কারণে আজ কলকাতার এই গর্বের প্রতীক ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।


