বীরভূমের দূর গ্রাম পাইকরের দর্জিপাড়া। সেখানকার একটি হতদরিদ্র পরিবারের কথা আমরা তুলে ধরেছি। দানিশ শেখ, তাঁর স্ত্রী সোনালি বিবি, ছোট্ট মেয়ে আনিশা, ছেলে আর শ্বশুর-শাশুড়ি—সবাই মিলে দিল্লির পথে পাড়ি দিয়েছিলেন। কারণটা সোজা, পেটের ভাত জোগাড় করা। ভাংরি কুড়িয়ে, বেচে, কোনোমতে দিন চালাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু জীবনের চাকা যে এভাবে উল্টে যাবে, সেটা কে জানত?
কুরবানির সময় এল। দানিশের শ্বশুর ভোদু শেখ, তাঁর স্ত্রী আর নাতনি আনিশাকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। বাকি পরিবার থেকে যায় দিল্লিতে। কিন্তু দিন যায়, সপ্তাহ যায়, দানিশ, সোনালি আর তাঁদের ছেলের কোনো খোঁজ মেলে না। ভোদু শেখের মন বসে না। দিল্লির পড়শিদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, পুলিশ এসে দানিশদের আটক করেছে। খবরটা শুনে আর দেরি করেননি তিনি। হাঁপানির রোগী হয়েও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ছুটলেন দিল্লি। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা শুনলেন, তাতে পায়ের তলার মাটি সরে গেল। পুলিশ বলল, “তোমার মেয়ে-জামাইকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
কীভাবে এমনটা হল? জানা গেল, গত ১৮ জুন দিল্লি পুলিশ দানিশ, সোনালি আর তাঁদের ছেলেকে আটক করে। তারপর ২৬ জুন বিএসএফের হাত দিয়ে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শুধু দানিশরাই নন, পাইকরের আরেক পরিবার—সুইটি বিবি আর তাঁর দুই ছেলে—তাঁদেরও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। বাংলাদেশে পৌঁছে তারা একটা ভিডিও বার্তা পাঠাতে পেরেছিল। কাঁদতে কাঁদতে সোনালি আর সুইটি বলছিলেন, “আমরা তো বাংলাদেশি নই। তবুও পুলিশ আমাদের এখানে পাঠিয়ে দিল। গাড়িতে তোলার সময় মারধর করল, ছবি তুলল, আঙুলের ছাপ নিল, হাসপাতালে পরীক্ষা করাল। তারপর এই ফাঁকা জায়গায় ছেড়ে দিয়ে গেছে। খাবার নেই, কাপড় নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। চেয়ে-চিন্তে বাচ্চাদের পেট ভরাচ্ছি।” সেই ভিডিওর পর আর কোনো যোগাযোগ নেই।
এদিকে ভোদু শেখের জীবন থমকে গেছে। হাঁপানির দাপটে শরীর ভেঙে পড়ছে। চার বছরের নাতনি আনিশা মায়ের জন্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। দিল্লিতে দাদু-দিদার কাছে থেকেও তার মন পড়ে আছে মা-বাবার কাছে। ভোদু শেখ বলছেন, “আমাদের কাছে ১৯৬৬ সালের দলিল আছে। আমরা এদেশেরই মানুষ। তবুও কেন আমাদের বাংলাদেশি বলে পাঠিয়ে দিল? গরিব বলেই কি আমাদের ওপর এত অত্যাচার?”
এই ঘটনা নিয়ে গত ৯ জুলাই কলকাতা হাইকোর্টে একটি হেবিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের হয়। আদালত দিল্লি সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে—কোন আইনে, কীসের ভিত্তিতে এই পরিবারকে আটক করা হল? কেন তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হল? এরাজ্যের মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আর দিল্লি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো বিষয়টির তথ্য জোগাড় করতে। কিন্তু আদালতের প্রশ্নের উত্তর আসার আগেই ভোদু শেখের মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনিরা কোথায়? কীভাবে দিন কাটাচ্ছে তারা?
এই গল্প শুধু দানিশ বা সুইটির নয়। এটা গরিব মানুষের জীবনের এক নিষ্ঠুর ছবি। যাদের কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে চায় না, যাদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয় কোনো কারণ ছাড়াই। আনিশার কান্না আর ভোদু শেখের হাঁপানির কাশি যেন সেইlessনিষ্ঠুরতারই প্রতিধ্বনি।


