সেই তো মল খসালি, তবে কেন লোক হাসালি?- একদা সিপিএম-এর কট্টরপন্থী অংশের চোখের মণি (কেউ কেউ বলেন প্রকাশ কারাটের ভাবশিষ্য), অধুনা রাহুল গান্ধীর অনুগামী তালিকায় তাজা সংযোজন প্রসেনজিৎ বোসের কাণ্ডকারখানা দেখে সেটাই মনে আসা স্বাভাবিক। কংগ্রেসের সঙ্গে সখ্যতা বাড়ালে সিপিএমের জাত যাবে – এই অভিযোগ করে তিনি ২০১২ সালে সিপিএম থেকে পদত্যাগ করেন। আজকে জাতের চিন্তা ছেড়ে তিনি কী ভাতের জন্য কংগ্রেসে মিশে গেলেন? কংগ্রেসে তাদের প্রাক্তন তাত্ত্বিককে দেখে কী সিপিএমের পাঁচমিশালী জোট তিতিয়ে যাবে? নাকি পাঁচমিশালী জোটকে সুস্বাদু করতেই কংগ্রেসে প্রসেনজিতের আগমন? এই সমস্ত প্রশ্নে সরগরম রাজনৈতিক মহল।
প্রসেনজিৎ বসু এককালে বাম তাত্ত্বিক মহলে উঠতি তারকা হিসেবে গণ্য হতেন। জেএনইউ প্রশিক্ষিত এই অর্থনীতিবিদ সিপিএম-এর গবেষণা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দায়িত্বও পেয়েছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন বামেদের কট্টরপন্থী মহলের নেতা প্রকাশ কারাটের ঘনিষ্ঠ। ২০১২ সাল থেকে, সিপিএমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৃণমূল ও বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতিকে মাত করতে যখন তারা কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে শুরু করে তখন থেকেই প্রসেনজিৎ বোস বেঁকে বসেন। বিচ্ছেদটি পাকাপাকি হয় যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রয়াত কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জিকে বামেরা সমর্থন দেয়। সেইসময় তৎকালীন বাম ছাত্রনেতার (অধুনা তৃণমূল সাংসদ) সঙ্গে ব্যক্তিগত কাজিয়াও এই বিচ্ছেদ ত্বরান্বিত করে। তার পর প্রসেনজিৎ ধারাবাহিকভাবে বাম-কংগ্রেস নৈকট্য ও পরে বাম-কংগ্রেস জোটের বিরুদ্ধে বলে গেছেন। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসবার পর তিনি বিজেপির উত্থানের জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করেছিলেন। তাছাড়া এনরেগা, খাদ্য সুরক্ষা বিল ইত্যাদির মতো কংগ্রেস সরকারের জনকল্যাণমূলক নীতিকেও তিনি কটাক্ষ করতে বাদ রাখেননি। কংগ্রেস সম্পর্কে তাঁর মতামত নেতিবাচক ছিল বললেও কম বলা হয়। বিভিন্ন সময়ে তিনি কংগ্রেসকে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত কর্পোরেটদের দালাল, সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী বলেছেন, এবং বহুবার গান্ধী পরিবারের প্রভাব ও এমনকী রাহুল গান্ধীকেও তিরস্কার করেছেন। অর্থাৎ তাঁর অবস্থান রাজনৈতিক বর্ণালীর এক্কেবারে বাম প্রান্তে ছিল তা বলাই বাহুল্য। সেখান থেকে এতটা সরে এসে তিনি যে কংগ্রেসের মতো মধ্যপন্থী দলের হাত ধরবেন, তা তাঁর অনুরাগীদের কাছেও কিছুটা আশ্চর্যজনক।
প্রসেনজিৎ যখন সিপিএম ছাড়েন তাঁর সঙ্গে সিপিএমের কিছু কর্মী ও অনুরাগীরাও পার্টির সঙ্গ ত্যাগ করেন। এনবিটিভি তাদের কয়েকজনের প্রতিক্রিয়া নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ ফোন কেটে দেন, কেউ প্রতিক্রিয়া দিতে অস্বীকার করেন, আবার কেউ বলেন প্ৰতিক্রিয়া দিতে গেলে আগে তিনি কলকাতায় আসবেন তারপর বলবেন। কিন্তু হাসনাইন ইমাম বাকিদের মতো আমাদের এড়িয়ে যাননি। তিনি সরাসরি প্রসেনজিতকে নতুন ইনিংসের শুভেচ্ছা জানান এবং বলেন এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের হাত শক্ত করাই উচিত কাজ। অবশ্য তিনিও এককালে কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমের সখ্যতার বাড়াবাড়ি হচ্ছে বলে প্রসেনজিতের সাথে সিপিএম দল ত্যাগ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী তখন তৃণমূল ও বিজেপিকে রুখতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে সিপিএম ভুল করেছিল, কিন্তু আজ তৃণমূল আর বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে প্রসেনজিৎ বোস কংগ্রেসে গিয়ে ঠিক করেছেন।
বাংলার রাজনীতি ইদানিং কালে অনেক পাল্টিবাজি, ডিগবাজি দেখেছে। বর্তমান বাংলার রাজনীতির বহু বৈশিষ্ট্যের মতো, এটারও সূত্রপাত করেছিলেন একদা কংগ্রেসের ‘ঘরের মেয়ে’ ও ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা ব্যানার্জী, যখন তিনি ‘৯০ এর দশকে ভারতের রাজনৈতিক ময়দানের উদীয়মান শক্তি বিজেপির হাত ধরতে কংগ্রেসের হাত ছেড়ে তাঁর নিজস্ব দল তৃণমূল কংগ্রেস তৈরী করেন। ২০১৬ সালে তৃণমূলকে নির্মূল করতে বাম-কংগ্রেস জোটের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ওমপ্রকাশ মিশ্র। অবশ্য তিন বছরের মধ্যেই তিনি নিজে সমূলে তৃণমূলে যোগদান করেন। মুর্শিদাবাদ ও মালদহে তৃণমূলের বেশিরভাগ নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিরা কংগ্রেসের থেকেই ছিটকে এসেছেন উর্বর জমির সন্ধানে। ২০১৬ থেকে বিজেপি রাজ্যে প্রধান বিরোধীর ভূমিকায় আসার পর তো তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে নেতানেত্রীদের ঘূর্ণায়মান দরজার নির্মাণ হলো, যার ফলে এমন বহু নেতা রয়েছেন যারা নিজেরাও আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারেননা যে তাঁরা কোন দলে রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস যে সেই দরজা ২০২৬ এর নির্বাচনের প্রাক্কালে আবার ফ্যানের মতো ঘুরতে শুরু করবে। কিন্তু এহেন তাত্ত্বিকভাবে পরিশুদ্ধ বলে পরিচিত কোনো নেতার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে গমন বোধ হয় একটু খটকার বিষয়। এর সাথে বলে রাখা শ্রেয়, প্রসেনজিত একসময় সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত নেতা আব্দুর রাজ্জাক মোল্লার সঙ্গে মিলে একটি মঞ্চ পেতেছিলেন। কিন্তু দেখা যায় তৃণমূলের দাওয়াত পেলে রেজ্জাক মোল্লা মঞ্চ ভুলে ঘাসফুলে যোগ দেন। তাঁকেই অনুসরণ করে কী প্রসেনজিতের দক্ষিণপন্থার অভিমুখে গমন? তাঁর মতোই কী তাত্ত্বিক নেতা প্রসেনজিতের বোধোদয় হয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে মূলধারার রাজনীতিতে যেনতেন প্রকারণে জায়গা করে নিতে হবে? নেপথ্যে কী বিধানসভা নির্বাচনকে লক্ষ্য করে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা? সময়ই এসবের উত্তর দেবে।
সেই তো মল খসালি, তবে কেন লোক হাসালি? – কংগ্রেস বিরোধীতায় দলত্যাগী প্রসেনজিৎ আজ সেই কংগ্রেসেরই কোলে গিয়ে উঠলেন।
Popular Categories


