রাজস্থানের জয়পুরে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। আদর্শ নগর ও হাওয়া মহল—এই দুই বিধানসভা কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যক মুসলিম ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে শাসক বিজেপির বিরুদ্ধে। অভিযোগের জেরে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে পুরসভা নির্বাচনের আগে।
আদর্শ নগরে কংগ্রেসের ক্রীড়া সেলের পদাধিকারী এবং প্রাক্তন পুরসভা নির্বাচনের প্রার্থী শেহনওয়াজ জানান, তাঁর পরিবারের ৭০ থেকে ৮০ জন সদস্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আপত্তি জানানো হয়েছে। তাঁর দাবি, পরিবারের কেউই নাম কাটার জন্য আবেদন করেননি।
শেহনওয়াজের কথায়, “আমাদের বুথ লেভেল অফিসার আমান খোড়া আমাকে জানান, গোটা পরিবারের নামের বিরুদ্ধেই আপত্তি জমা পড়েছে। অথচ আমরা কেউই এমন কোনও আবেদন করিনি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের শেষ দিন ১৫ জানুয়ারি মুসলিম অধ্যুষিত ওয়ার্ডগুলিতে প্রতিটি বুথে ৩০০ থেকে ৪০০টি করে আপত্তিপত্র জমা পড়ে। এই ফর্মগুলিতে বিজেপির বুথ লেভেল এজেন্টদের সই রয়েছে বলে দেখানো হলেও, যাঁদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে—নইমুদ্দিন, সেলিম ও রশিদ—তাঁরা জানিয়েছেন, এই ফর্মগুলিতে তাঁদের সই নেই। ফলে সই জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
নথি থেকে জানা যাচ্ছে, একাধিক ‘ফর্ম ৭’-এ বিজেপির প্রাক্তন প্রার্থী রবি নায়ারের নাম ও সই রয়েছে। এই ফর্মগুলির মাধ্যমে একাধিক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল এজেন্ট নইমুদ্দিন লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি কোনও ফর্মে সই করেননি বা কাউকে অনুমতিও দেননি।
শেহনওয়াজের দাবি, রবি নায়ার নিজে প্রায় ২০০টি আপত্তিপত্রে সই করেছেন। এই বুথগুলির যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন বুথ লেভেল অফিসার আমান খোড়া ও রবি শর্মা।
আদর্শ নগরের কংগ্রেস বিধায়ক রফিক খানও এই অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “এটা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। আমাদের কাছে প্রমাণ আছে যে নির্দিষ্টভাবে সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম কাটার চেষ্টা হয়েছে।”
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে হাওয়া মহল বিধানসভা কেন্দ্রেও। এখানে বিজেপি ২০২৩ সালের নির্বাচনে মাত্র ৯৭৪ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছিল। এই কেন্দ্রের এক বুথ লেভেল অফিসার কীর্তি কুমারের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় বলতে শোনা যায়—প্রায় ৪৭০ জন ভোটারের বিরুদ্ধে আপত্তি গ্রহণ করতে তাঁর উপর চাপ দেওয়া হচ্ছে।
ভিডিওতে কীর্তি কুমার বলতে শোনা যায়, “আমি এটা করতে পারব না। এর চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।”
তাঁর দাবি, যাঁদের নাম কাটার জন্য বলা হচ্ছিল, তাঁদের অধিকাংশই মুসলিম ভোটার এবং কংগ্রেস সমর্থক। এমনকি যাঁদের পরিচয় ও বসবাস আগেই যাচাই করা হয়েছিল, তাঁদের নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়।
অন্য বুথ লেভেল অফিসাররাও জানান, আশপাশের হিন্দু অধ্যুষিত বুথে এমন কোনও আপত্তি জমা পড়েনি। শুধুমাত্র মুসলিম অধ্যুষিত বুথগুলিতেই বিপুল সংখ্যায় আপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, একজন বুথ লেভেল এজেন্ট দিনে সর্বোচ্চ ১০টি আপত্তি জমা দিতে পারেন। অথচ বিজেপির এক এজেন্ট স্বীকার করেছেন, তিনি দু’দিনে প্রায় ২০০ জন ভোটারের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন। স্থানীয় এক বিজেপি নেতা আবার দাবি করেছেন, তিনি একাই ৪৬৭ জন ভোটারের নাম কাটার আবেদন করেছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্য রাজনীতিও উত্তপ্ত। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি গোবিন্দ সিং দোতাসরা একে ভোটার তালিকা নিয়ে “ষড়যন্ত্র” বলে মন্তব্য করেছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গহলৌত অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘু ভোটারদের বঞ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
ঘটনার তদন্ত চললেও, জয়পুরের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ ও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।


