Friday, March 6, 2026
26.7 C
Kolkata

মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা Vs সমাজকর্মী হর্ষ মান্দারমুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোয় খেসারত চুকাতে হচ্ছে হর্ষ মান্দারকে!

অসমের রাজনীতিতে আবারও তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্য করে একের পর এক মন্তব্য এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে রাজ্যের ভিতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে।

হিমন্ত বিশ্বশর্মা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে কংগ্রেস দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি সেই দল ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। বিজেপিতে যোগদানের পর থেকেই তাঁর বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রতি কঠোর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। সরকারি জমি দখলের অভিযোগে বহু মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। বহু বাড়ি, দোকান, মাদ্রাসা এবং ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া হয়েছে বুলডোজার চালিয়ে। এই উচ্ছেদ অভিযানে মানবিক দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন বহু সমাজকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠন।এছাড়াও, বহুদিন ধরে অসমে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলিমদের বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে তাঁদের দেশছাড়া করার অভিযোগও উঠেছে রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে। যেসব মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অসমে বাস করছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে নানা হয়রানির মুখে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এই প্রক্রিয়ায় নিয়ম-কানুন ও মানবিকতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও সমালোচনা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন খ্যাতনামা সমাজকর্মী ও মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মান্দার। তিনি সাহসের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ দায়ের করেছেন। দিল্লির হাউজ খাস থানায় দায়ের করা এই এফআইআরে বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য মন্তব্যগুলি একটি নির্দিষ্ট ভাষাভাষী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা, বৈষম্য এবং শত্রুতার পরিবেশ তৈরি করছে। হর্ষ মান্দার তাঁর অভিযোগে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারার উল্লেখ করেছেন। এই ধারাগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা রোধ করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া থেকে বিরত রাখা এবং জনসমাজে অশান্তি ছড়ানো বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী সাংবিধানিক পদে থেকেও এই আইনগুলিকে অগ্রাহ্য করছেন। এই এফআইআরের পরই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা প্রকাশ্যে হর্ষ মান্দারের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, হর্ষ মান্দারের বিরুদ্ধে একশোরও বেশি মামলা করা হবে। তিনি আরও দাবি করেন, হর্ষ মান্দার নাকি অতীতে এনআরসি প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলেন এবং এখন তাঁকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ ভারতীয় আইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য অনুমোদিত নয়। সুপ্রিম কোর্ট আগেই নির্দেশ দিয়েছে, ঘৃণামূলক ভাষণ হলে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা নিতে পারে। এর জন্য আলাদা করে লিখিত অভিযোগের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে শাসক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগে পুলিশ তেমন সক্রিয় হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে। হর্ষ মান্দার অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর হুমকিতে ভয় পাওয়ার মানুষ নন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, অসহায় ও নিপীড়িত মুসলিমদের আইনি সহায়তা দেওয়া যদি অপরাধ হিসেবে ধরা হয়, তবে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়। কোন আইনের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও মন্তব্য করেন। তবে এই ধরনের হুমকি তাঁর কাজ বন্ধ করতে পারবে না বলেই জানিয়েছেন তিনি।

এনআরসি প্রক্রিয়ার সময় অসমে মুসলিম সমাজের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন হর্ষ মান্দার। তিনি জানান, নাগরিকপঞ্জি সংশোধনের সেই প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত জটিল। বহু দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করতে পারেননি। অনেককে ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখা হয়েছিল, যেখানে পরিস্থিতি ছিল কার্যত কারাগারের মতো।জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তরফে সংখ্যালঘু বিষয়ক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ডিটেনশন সেন্টারগুলি পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি দেখেন, বহু মানুষ বছরের পর বছর বন্দি অবস্থায় রয়েছেন, শুধু নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারার কারণে। এই বিষয়টি নিয়ে তিনি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলা গ্রহণ করে। আদালত তখন জানায়, কাউকে দীর্ঘদিন এভাবে বন্দি করে রাখা অসাংবিধানিক। হর্ষ মান্দার আরও বলেন, ডিটেনশন সেন্টারে থাকা অনেক মানুষ চরম হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেই সব পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং আইনি লড়াইয়ে সাহায্য করাই ছিল তাঁর কাজ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর দায়িত্ব।

Hot this week

রমযান ও যাকাত: আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা

রমযান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সময়।...

ইরান সংঘাত চলাকালীনই তীব্র হচ্ছে আফগানিস্তান-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, বাড়ছে উদ্বেগ!

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে আফগানিস্তান ও...

রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা হাসপাতালগুলিতে ফের কাউন্সেলিং ছাড়া নিয়োগে বাড়ছে ক্ষোভ

রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে চিকিৎসক মহলে...

খামেইনির শাহাদাতের পর ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে, বাড়ছে আন্তর্জাতিক কৌতূহল

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়ছে নতুন করে উত্তেজনা। ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র...

নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফরকে দেশের কূটনৈতিক বিপর্যয় মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র...

Topics

রমযান ও যাকাত: আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা

রমযান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সময়।...

রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা হাসপাতালগুলিতে ফের কাউন্সেলিং ছাড়া নিয়োগে বাড়ছে ক্ষোভ

রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে চিকিৎসক মহলে...

খামেইনির শাহাদাতের পর ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে, বাড়ছে আন্তর্জাতিক কৌতূহল

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়ছে নতুন করে উত্তেজনা। ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র...

নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফরকে দেশের কূটনৈতিক বিপর্যয় মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র...

আরামবাগে বহু সংখ্যালঘু ভোটারের নাম এখনও বিচারাধীন তালিকায়, বাড়ছে দুশ্চিন্তা

হুগলির আরামবাগে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই অনেক...

Related Articles

Popular Categories