ভারতে রান্নার গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে সম্প্রতি নানা উদ্বেগের কথা সামনে আসছে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে যে দেশে গ্যাসের কোনও বড় ঘাটতি নেই এবং সাধারণ মানুষের অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবুও বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহে সমস্যা দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন রাজ্য ও ব্যবসায়ী মহলে চিন্তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বুধবার কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। সরকারের দাবি, সাধারণ মানুষ যাতে আতঙ্কে পড়ে অতিরিক্ত সিলিন্ডার বুকিং না করেন সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। কারণ আতঙ্কে অতিরিক্ত বুকিং হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। সরকার জানায়, দেশের গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য গ্যাস সরবরাহকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জরুরি পরিষেবাগুলিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তবে একই দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা ভারত পেট্রোলিয়াম জানায়, পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এর ফলে এলপিজি সরবরাহে কিছু নিয়ন্ত্রণ আনতে হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে, যেমন হোটেল-রেস্তোরাঁ বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে সংস্থাগুলি। যদিও গৃহস্থালির ক্ষেত্রে যাতে সমস্যা না হয় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তামিলনাড়ুর তিরুচিতে এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। তবুও ভারত নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। তিনি বলেন, কোভিড মহামারির সময় যেমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশ সফলভাবে লড়াই করেছে, তেমনভাবেই এবারও সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, এলএনজি বহনকারী দুটি জাহাজ ভারতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে এবং খুব শিগগিরই দেশে পৌঁছাবে। বর্তমানে ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানির উপর নির্ভরশীল। এর বেশিরভাগই আসে পশ্চিম এশিয়ার অঞ্চল দিয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের তেল শোধনাগারগুলিকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশীয় উৎপাদনও প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।সরকার আরও জানিয়েছে, গ্যাসের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে একটি পর্যবেক্ষক কমিটি তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস বুকিংয়ের নিয়মেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে দুটি বুকিংয়ের মধ্যে কমপক্ষে ২১ দিনের ব্যবধান রাখতে হত, এখন তা বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। এতে করে অযথা মজুতদারি কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে গ্যাসের ঘাটতির অভিযোগ উঠছে। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির কারণে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন। তাঁর মতে, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের উপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।
তামিলনাড়ুতেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, গৃহস্থালির জন্য কিছুদিনের মজুত থাকলেও বাণিজ্যিক গ্যাসের সরবরাহ খুবই সীমিত। এর ফলে ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং হোটেল ব্যবসা মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়েছে।
দেশের বিভিন্ন শহরে রেস্তোরাঁগুলিও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। কোথাও গ্যাসের অভাবে রান্নার মেনু কমাতে হচ্ছে, আবার কোথাও বাড়তি খরচের চাপ বাড়ছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে ছোট হোটেল ও খাবারের দোকানগুলির পক্ষে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে কর্মীদের চাকরি ও মজুরির উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করলেও রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহল এখন পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় রয়েছে।


