এবারের ২৫ বৈশাখ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে এক নতুন পরিস্থিতির সাক্ষী হতে চলেছে। বহু বছর ধরে রাজ্য বাঙালির উদ্যোগে কলকাতায় যে ভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালন করা হতো, এবার সেই ধারায় বিরতি পড়ছে। কারণ, একই দিনে রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার কথা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের একাধিক মুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক মহলের মতে, ২৫ বৈশাখের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনকে শপথ গ্রহণের জন্য বেছে নেওয়ার মধ্যে একটি বিশেষ বার্তা রয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানাতেই এই দিনে অনুষ্ঠান করা হচ্ছে এবং সেখানে রবীন্দ্রনাথকেও স্মরণ করা হবে।
তবে সরকারি উদ্যোগে রবীন্দ্রজয়ন্তী না হওয়ায় একাংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মত, ভবিষ্যতে এই দিনটি কি শুধুই নতুন সরকারের শপথের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে? কারণ, কলকাতায় প্রতি বছর ২৫ বৈশাখ উপলক্ষে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। গান, কবিতা ও নৃত্যানুষ্ঠানে মুখর থাকত শহর। বামফ্রন্ট সরকারের সময় নন্দন ও রবীন্দ্র সদন চত্বরে সকাল থেকে অনুষ্ঠান চলত। পরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনুষ্ঠান ক্যাথিড্রাল রোড এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের তত্ত্বাবধানে বিকেলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আসর বসত। শিল্পীদের নির্বাচন করার জন্য বিশেষ অডিশনের ব্যবস্থাও করা হতো। শুধু কলকাতাই নয়, জেলার রবীন্দ্র ভবনগুলিতেও সরকারি উদ্যোগে পালিত হতো কবিগুরুর জন্মদিন।
কিন্তু এবার সেই প্রস্তুতি দেখা যায়নি। প্রশাসনের একাংশের দাবি, নির্বাচন এবং নতুন সরকারের শপথ আয়োজন নিয়েই সরকারি কর্মীদের অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সামলাতে প্রশাসনকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। তাই রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান আয়োজনের দিকে আলাদা করে নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
রাজ্যে বিজেপির এই প্রথম সরকার গঠনকে ঘিরে রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংগঠন সীমিত ছিল। বামফ্রন্ট আমলে বিধানসভায় দলের উপস্থিতিও প্রায় ছিল না। ২০১১ সালের পর ধীরে ধীরে সংগঠন শক্তিশালী করে বিজেপি। এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর দলের নেতারা এটিকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে তুলে ধরছেন। তাদের বক্তব্য, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিতেই বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো।
অন্যদিকে, কয়েকটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন আলাদা ভাবে ২৫ বৈশাখ পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘বিদ্বেষের রাজনীতি বিরোধী জনমঞ্চ’ নামে একটি সংগঠন বাগবাজার ঘাট থেকে জোড়াসাঁকো হয়ে নাখোদা মসজিদ পর্যন্ত পদযাত্রার আয়োজন করেছে। কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘পাশে হাঁটছেন রবীন্দ্রনাথ, ভালোবাসার যুদ্ধযাত্রা’।সংগঠনের উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, রবীন্দ্রনাথ একসময় সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিতে এই পথেই হেঁটেছিলেন। সেই স্মৃতিকে সামনে রেখেই তাঁরা সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান। গান, কবিতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে তারা ২৫ বৈশাখ পালন করবেন বলে জানিয়েছেন।


