ভারতে পণ-প্রথাকে কেন্দ্র করে নারীদের উপর নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা এখনও ভয়াবহ আকারে অব্যাহত রয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-এর সর্বশেষ ‘ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া ২০২৪’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে দেশে মোট ৫,৭৩৭টি পণজনিত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ জন নারী পণ-সংক্রান্ত হয়রানি, গার্হস্থ্য নির্যাতন, আত্মহত্যা কিংবা সন্দেহজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। হিসেব অনুযায়ী, প্রতি ৯০ মিনিটে একজন নারীর মৃত্যু ঘটেছে পণকে কেন্দ্র করে।
৬ মে প্রকাশিত NCRB-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কঠোর আইন ও সচেতনতা প্রচার চালানো হলেও সমাজে পণ-সংক্রান্ত অপরাধের প্রবণতা এখনও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে।
গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ২০১৫ সালে যেখানে এমন ঘটনার সংখ্যা ছিল ৭,৬৩৪টি, সেখানে ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৫,৭৩৭টিতে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যাগত এই হ্রাস সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ-নির্ভর সহিংসতার প্রকোপ এখনও গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, পণ-সংক্রান্ত হয়রানির মামলাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০২৩ সালে ‘পণ নিবারণ আইন’-এর অধীনে মোট ১৫,৪৮৯টি মামলা দায়ের হয়, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি, ২০২৪ সালে ‘স্বামী ও তার আত্মীয়দের দ্বারা নিষ্ঠুরতা’র ১ লক্ষ ২০ হাজারেরও বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতি বছর এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা এক লক্ষের উপরে থাকছে।
মহানগরগুলোর মধ্যে টানা পঞ্চমবারের মতো পণজনিত মৃত্যুর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দিল্লি। ২০২৪ সালে সেখানে ১০৯টি ঘটনায় মোট ১১১ জন নারীর মৃত্যু হয়েছে। দিল্লিতে প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় পণজনিত মৃত্যুর হার ছিল ১.৪। তুলনায় কানপুরে ৫৪টি এবং বেঙ্গালুরুতে ২৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, কোচি ও চেন্নাইয়ে এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি পণজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে উত্তরপ্রদেশে। সেখানে মোট ২,০৩৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা দেশের মোট ঘটনার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার, যেখানে ১,০৭৮টি ঘটনা সামনে এসেছে। মধ্যপ্রদেশে ৪৫০টি, রাজস্থানে ৩৮৬টি এবং পশ্চিমবঙ্গে ৩৩৭টি পণজনিত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
‘পণজনিত হত্যাকাণ্ড’-এর ঘটনাতেও উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। ২০২৪ সালে রাজ্যে ১৬৩টি এমন ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওড়িশায় এই সংখ্যা ১৬১। রাজস্থানে ৭৫টি, বিহারে ৬৬টি এবং উত্তরপ্রদেশে ৫৮টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে।
স্বামী ও তাঁর আত্মীয়দের দ্বারা নারীদের উপর নিষ্ঠুর আচরণের ক্ষেত্রেও উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষে রয়েছে। উত্তরপ্রদেশে এমন ২১,২৬৬টি এবং পশ্চিমবঙ্গে ১৯,৬৬৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। মহারাষ্ট্র, রাজস্থান ও তেলেঙ্গানাতেও ১০ হাজারের বেশি ঘটনা সামনে এসেছে।
NCRB আরও জানিয়েছে, পণ-নিষেধ আইন অনুযায়ী দায়ের হওয়া মামলাগুলোর প্রায় ৩৭ শতাংশই ২০২৪ সালে অমীমাংসিত অবস্থায় ছিল। গত কয়েক বছর ধরেই এই অমীমাংসিত মামলার হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
বর্তমানে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’-র ৮০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বিয়ের সাত বছরের মধ্যে কোনো নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তার আগে পণ-দাবিকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের প্রমাণ মিললে সেই ঘটনাকে ‘পণজনিত মৃত্যু’ হিসেবে গণ্য করা হয়। আগে এই বিধানটি ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪-বি ধারার অধীনে ছিল।
সম্প্রতি তৃষা শর্মা ও দীপিকা নাগারের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে পণ-প্রথা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ, বিয়ের পর পণ-দাবিকে কেন্দ্র করে তাঁদের উপর দীর্ঘদিন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এছাড়া, চলতি বছরের শুরুতে এক নারী SWAT কমান্ডোর মৃত্যুর ঘটনাতেও স্বামীর বিরুদ্ধে পণ-দাবিকে কেন্দ্র করে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে পণ-সংক্রান্ত সহিংসতার এই ধারাবাহিকতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—আইন থাকা সত্ত্বেও কেন বন্ধ হচ্ছে না পণ-প্রথা এবং নারীদের বিরুদ্ধে এই নির্মম সহিংসতা।


