আগস্ট মাসের শুরু থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত মালদহ মেডিক্যাল কলেজে মোট ৮৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জুলাই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৭৭ শিশুর। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অপুষ্টিজনিত সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি। পাশাপাশি প্রসূতিদের স্বাস্থ্য, হাসপাতালের পরিকাঠামো এবং জেলা স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যেই শনিবার সকালে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শনে যায় স্বাস্থ্য দফতরের বিশেষজ্ঞ দল। হাসপাতালের বিভিন্ন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেন কমিটির সদস্যরা। পরে সাংবাদিক বৈঠকে গোটা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত জানান বিশেষজ্ঞ দলের চেয়ারম্যান তথা রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের অতিরিক্ত ডিরেক্টর প্রলয় আচার্য।
প্রলয় জানান, আগস্ট মাসে এখনও পর্যন্ত মালদহ মেডিক্যাল কলেজে মোট ৮৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই মৃত্যুর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে অপুষ্টিজনিত সমস্যাকে বিশেষ ভাবে দায়ী করা হচ্ছে। পাশাপাশি বহু শিশু জন্মের পরই শ্বাসকষ্ট, হৃদ্রোগ, জন্ডিস এবং কম ওজনের মতো সমস্যায় আক্রান্ত ছিল বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞ দলের মতে, শিশুমৃত্যু কমাতে শুধু সদ্যোজাতদের চিকিৎসার দিকে নজর দিলেই হবে না। গর্ভাবস্থা থেকেই প্রসূতিদের স্বাস্থ্যের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে প্রসূতি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন করার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান।
পরিদর্শনের পর জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেশ কিছু ত্রুটিও চিহ্নিত করেছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। বিশেষ করে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। সেই ঘাটতি দ্রুত মেটাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রলয় আচার্যের কথায়, কোথায় কী ব্যবস্থা নিলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফেও একাধিক পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এর পাশাপাশি মালদহের বিভিন্ন নার্সিংহোমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়েও নজর রয়েছে বিশেষজ্ঞ দলের। অবৈধ গর্ভপাতের কোনও ‘চক্র’ রয়েছে কি না, সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার কথাও জানিয়েছেন কমিটির সদস্যেরা।
উল্লেখ্য, অগস্ট মাসে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে একদিনে ১০টি শিশুর মৃত্যু এবং মাসের শুরু থেকে ৬০ জন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা এবং পরিকাঠামো নিয়েও।
তখন মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, একদিনে মৃত ১০ নবজাতকের মধ্যে আটজনের জন্ম হয়েছিল জেলার অন্য হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের মালদহ মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে আসা হয়েছিল। ওই দিন মালদহ মেডিক্যাল কলেজে জন্ম নেওয়া দু’টি শিশুও মারা যায় বলে জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।
পরপর শিশুমৃত্যুর ঘটনায় মালদহের একাধিক নার্সিংহোমে অভিযান চালানো হয়। পাশাপাশি মালদহ মেডিক্যাল কলেজের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চেয়ে পাঠায় স্বাস্থ্য দফতর। এরপরই স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশে বিশেষজ্ঞ কমিটি মালদহ মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শন করে।
এখন বিশেষজ্ঞ দলের রিপোর্টে অপুষ্টি, প্রসূতিদের স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের মতো বিষয় সামনে আসায় শিশুমৃত্যু ঠেকাতে দ্রুত পদক্ষেপের উপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।


