Thursday, September 10, 2026
29 C
Kolkata

বিধানসভায় পাশ ‘বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধনী বিল’! কী আছে এই বিলে?

বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলির প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বদলের লক্ষ্যে আনা ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিস অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ বৃহস্পতিবার বিধানসভায় পাশ হল। বিশেষ অধিবেশন ডেকে মূলত এই বিল পাশ করানোই ছিল রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্য। ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে পড়ে ১৭১টি ভোট এবং বিপক্ষে ১৫টি ভোট।

বুধবার যাদবপুর এলাকায় এক জমায়েতে যোগ দিয়ে বিধানসভায় নিজের বক্তব্য রাখার কথা জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই মতো বৃহস্পতিবার বিধানসভায় অতিরিক্ত সময় নিয়ে ভাষণ দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়েই ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বামপন্থী রাজনীতির সমালোচনা।

মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে যেন ‘এক অন্য রাষ্ট্র’ তৈরি হয়েছে। সেখানে দেশবিরোধী কার্যকলাপ এবং দেশ ভাঙার চেষ্টা চলে বলেও দাবি করেন তিনি। কড়া ভাষায় শুভেন্দু বলেন, “টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং-কে আমরাই টুকরো করে দেব।”

বিলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন, এই আইনের অপপ্রয়োগ করা হবে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে ‘কিষেণজি লাল সেলাম’, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ কিংবা ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজ়াদি’-র মতো স্লোগান লেখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই ধরনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যের আটটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের তুলনামূলকভাবে নবীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পড়ুয়ারাও অভিজ্ঞ শিক্ষক ও কর্মীদের পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে সরকারের দাবি।

এই প্রসঙ্গে বামপন্থী মতাদর্শকে কটাক্ষ করে শুভেন্দু বলেন, “তথাকথিত সমাজবাদ যাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের বিরাট মেধাকে আমরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কাজে লাগাতে চাই। এতে আপত্তির কী আছে?”

সরকারের দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে মানবসম্পদের আরও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বদলি হওয়া শিক্ষক, আধিকারিক ও কর্মীদের চাকরির শর্ত, সিনিয়রিটি এবং অন্যান্য অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।

সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ২০১৭ সালের আইনে কলেজের শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক, আধিকারিক এবং অশিক্ষক কর্মীদের এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে বদলির বিধান ছিল। কিন্তু এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মী বদলির জন্য নির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা ছিল না। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই এবার সংশোধনী আনা হয়েছে।

মূলত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ আইনে সংশোধন করে নতুন ১৪-এ ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, প্রশাসনিক প্রয়োজনে রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে আচার্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করতে পারবেন।

বদলি হওয়া কর্মীরা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কোনও কর্মী চাইলে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রাথমিক নিয়োগ হয়েছিল, সেখানে লিয়েন বজায় রাখতে পারবেন। আবার চাইলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়েই স্থায়ীভাবে থাকতে পারবেন।

জনস্বার্থে বদলি হওয়ার পর পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে লিয়েন না রাখলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর সিনিয়রিটি নির্ধারণ করা হবে ওই পদে তাঁর প্রাথমিক নিয়োগের তারিখ অনুযায়ী। সংশোধিত আইনে আচার্যকেই নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

সংশোধিত বিলের বিভিন্ন ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আধিকারিক ও কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ১৯৮৩ সালের প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রভিডেন্ট ফান্ড পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

সরকারের দাবি, রাজ্যের ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভিডেন্ট ফান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরি করতেই এই সংশোধন প্রয়োজন। বিলটি কার্যকর হলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রভিডেন্ট ফান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিন্ন বিধান চালু হবে। প্রয়োজনীয় বাজেট সংক্রান্ত ব্যবস্থা অর্থ দফতরের সঙ্গে পরামর্শ করে করা হবে বলেও বিলে উল্লেখ রয়েছে।

তবে বিলটি নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন বিরোধী বিধায়করা। তৃণমূলের কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক আলিফা আহমেদ, আইএসএফ-এর ভাঙড়ের বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকি এবং ডোমকলের সিপিএম বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান-সহ একাধিক বিধায়ক বিলটির অপপ্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তাঁদের প্রশ্ন, এত তাড়াহুড়ো করে কেন এই বিল পাশ করানো হচ্ছে? জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কিসের তাড়া, তা সকলেই জানেন। সমঝদারের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট।”

অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, এই বিলে মূলত এমন একটি ব্যবস্থাকেই আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে, যা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই প্রচলিত। তাঁর বক্তব্য, প্রাচীনকাল থেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষক-কর্মী আদানপ্রদান হয়ে থাকে। দেশের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও বিশেষ পরিস্থিতিতে এমন ব্যবস্থা রয়েছে।

ফলে সরকারের দাবি, এই সংশোধনী কোনও সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে না; বরং প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং মানবসম্পদের কার্যকর ব্যবহারের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হচ্ছে।

Hot this week

ভাঙনের গ্রাসে মালদহের ভূতনি, ত্রাণ তহবিলে আরও ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

ভাঙন ও বন্যার ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত মালদহের ভূতনি। গঙ্গার গ্রাসে...

‘এত দেরিতে কাজ হওয়ায় আমি লজ্জিত’ মুম্বই-গোয়া হাইওয়ের কাজে ক্ষোভ প্রকাশ নীতীন গড়করি!

মুম্বই-গোয়া হাইওয়ের কাজ নিয়ে এবার প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানালেন কেন্দ্রীয়...

‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ সুপ্রিম কোর্টের এক্তিয়ার নেই, সিদ্ধান্ত সংসদের! জানালো কেন্দ্র সরকার

বৈবাহিক সম্পর্কে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে...

Topics

‘এত দেরিতে কাজ হওয়ায় আমি লজ্জিত’ মুম্বই-গোয়া হাইওয়ের কাজে ক্ষোভ প্রকাশ নীতীন গড়করি!

মুম্বই-গোয়া হাইওয়ের কাজ নিয়ে এবার প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানালেন কেন্দ্রীয়...

‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ সুপ্রিম কোর্টের এক্তিয়ার নেই, সিদ্ধান্ত সংসদের! জানালো কেন্দ্র সরকার

বৈবাহিক সম্পর্কে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে...

বাংলা-সহ ৫ রাজ্যে ভোটের আগে বিজেপির ঝুলিতে ১৫০০ কোটি, বিপুল অনুদান ঘিরে উঠছে প্রশ্ন বিরোধীদের!

পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির তহবিলে বিপুল অঙ্কের...

BRICS থেকে ভারতের কী লাভ? প্রশ্ন চিদাম্বরমের, কংগ্রেসকে পাল্টা নিশানা বিজেপির

নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর BRICS শীর্ষ সম্মেলন।...

Related Articles

Popular Categories