ভাঙন ও বন্যার ভয়াবহতায় বিপর্যস্ত মালদহের ভূতনি। গঙ্গার গ্রাসে একের পর এক এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় মাথার ছাদ হারিয়ে বহু বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণ শিবিরে। বানভাসি মানুষের খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর জোগান দেওয়া হচ্ছে সরকারি ত্রাণের মাধ্যমে। এই পরিস্থিতিতে ভূতনির মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ তহবিলে আরও ৫ কোটি টাকা আর্থিক বরাদ্দ করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই বুধবার ভূতনির ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে আকাশপথে পরিদর্শনে যান রাজ্যের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের একটি দল। বুধবার কপ্টারে মালদহে পৌঁছন রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি রাজেশ সিনহা, ডিজি সিভিল ডিফেন্স সঞ্জয় সিং এবং আইজি নর্থবেঙ্গল সুকেশ জৈন। প্রথমে জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে ভূতনির পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন তাঁরা। পরে প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে আকাশপথে বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনের পর বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি রাজেশ সিনহা বলেন, “ভূতনি পুরোপুরি প্লাবিত। প্রচুর জল রয়েছে সেখানে। এই জল নামতে অনেক দেরি হবে। বন্যা পরিস্থিতির সবদিক খতিয়ে দেখা হয়েছে। সেখানে যেন কোনও রোগ না ছড়ায়, সেটাও দেখা হচ্ছে। বানভাসিদের নিরাপদ জায়গায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ত্রাণসামগ্রী বিলির কাজ চলছে।”
প্রশাসন সূত্রে খবর, এদিনও গঙ্গার জল চরম বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। সেচ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মানিকচক ঘাটে গঙ্গার জলস্তর বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছিল। ইতিমধ্যেই ভূতনির শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ জলবন্দি বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। হিরানন্দপুর, উত্তর চণ্ডীপুর এবং দক্ষিণ চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
তবে পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে উত্তর চণ্ডীপুর এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি মেনে প্রশাসনের তরফে দক্ষিণ চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ফুলহর নদীর বাঁধের একটি অংশ কেটে দেওয়া হয়েছে। ওই অংশ দিয়ে উত্তর চণ্ডীপুর এলাকা থেকে গঙ্গার জল ফুলহর নদীর দিকে নামতে শুরু করেছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য ছিল, ভূতনির একদিকে গঙ্গা, অন্যদিকে ফুলহর নদী। ফলে দক্ষিণ চণ্ডীপুরের বাঁধ কেটে দিলে চর এলাকা থেকে গঙ্গার জল দ্রুত ফুলহরে চলে যেতে পারে। তাতে উত্তর চণ্ডীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার জল কিছুটা নামবে। প্রশাসনের উদ্যোগে সেই ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর ওই এলাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
তবে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ফুলহর নদীর জলস্তর নিয়েও। ফুলহরের জল বাড়তে থাকায় রতুয়ার মহানন্দাটোলা পুলিশ ফাঁড়ি এবং স্থানীয় ডাকঘর জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এমনকি একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও জলের তলায় চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শুধু ভূতনি নয়, বৈষ্ণবনগর এবং কুম্ভরার মতো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাতেও জল ঢুকেছে। বানভাসিদের উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানিয়েছেন, বৈষ্ণবনগর ও পারলালপুর সংলগ্ন বেশ কিছু এলাকায় জল ঢুকেছে। কোথাও দু’ফুট, আবার কোথাও চার ফুট পর্যন্ত জল দাঁড়িয়ে রয়েছে।
প্রবল ভাঙন ও জলস্তর বৃদ্ধির জেরে ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ভূতনির পরিস্থিতি। প্রশাসনিক আধিকারিকদের অনুমান, শুক্রবার থেকে জলস্তর কিছুটা কমতে পারে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চাইছে না প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও পরিস্থিতির উপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখছেন বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। সেচ দপ্তর এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর তরফে চলছে লাগাতার নজরদারি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দফায় দফায় বৈঠকও করা হচ্ছে।

