Wednesday, July 22, 2026
26.1 C
Kolkata

বিহারের নিবিড় সংশোধন (SIR): ঘুরে পথে NRC লাঘু করার চেষ্টা

বিহারে ভারতের নির্বাচন কমিশনের চলমান বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি ভাষ্যমতে, এটি ভোটার তালিকাকে পরিচ্ছন্ন ও আপডেট করার একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা, যার মধ্যে জাতীয় নাগরিক রেজিস্টার (NRC)-র ছায়া দেখা যাচ্ছে। আসামে NRC-এর ফলে প্রায় ২০ লাখ মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম, দলিত, নারী ও দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ নাগরিকত্বহীনতার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। বিহারের SIR-ও সেই একই পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে।

কী এই SIR এবং কেন এত ভয়ঙ্কর?

এই প্রক্রিয়ার আকার ও উদ্দেশ্য সত্যিই উদ্বেগজনক। ১৯৮৭ সালের পরে জন্মগ্রহণকারী এবং ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ৪.৭৬ কোটিরও বেশি মানুষকে এখন তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে তাদের এমন কিছু নথি জমা দিতে হবে। যারা তরুণ, ভূমিহীন, অভিবাসী বা নিরক্ষর—তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া একটি দুঃস্বপ্ন। এই মানুষদের কাছে প্রায়ই কোনো নথি থাকে না, আর তাই তারা ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এটি সংবিধানের মূল নীতির উল্টো পথে চলছে—যে নীতি বলে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার আছে, যতক্ষণ না অন্যথা প্রমাণিত হয়। কিন্তু এখন সেই প্রমাণের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের অপমান ও বৈষম্যের ছায়া

এই প্রক্রিয়া সংবিধানের ১৪, ১৯ ও ২১ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। সমতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার এখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধার কার্ড—যা সরকারি কাজে বাধ্যতামূলক— তা এখানে গ্রহণযোগ্যই নয়। তার বদলে স্কুল সার্টিফিকেট, জমির দলিল বা পৈতৃক জন্মের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে। এটি উচ্চবর্ণ, সম্পত্তিশালী ও নথি-সমৃদ্ধদের পক্ষে কাজ করছে, আর ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক মানুষদের শাস্তি দিচ্ছে। আজকের গণতান্ত্রিক ভারতে এমন পশ্চাদগামী যুক্তি সর্বজনীন ভোটাধিকারের মূল ধারণাকেই অস্বীকার করে।

সংক্ষিপ্ত সময়সীমা

SIR-এর সময়সীমা এতটাই সংক্ষিপ্ত যে এত বড় সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে নথি সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। সাধারণ মানুষকে এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ঠিকমতো জানানো হয়নি। অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়, বরং নির্বাচনী ও বিশৃঙ্খল বলে মনে হচ্ছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা সঠিক নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ করছেন। ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, ভয় ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ছে—বিশেষ করে দলিত, মুসলিম ও নারীদের মধ্যে।

বিহারের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

এই প্রক্রিয়া শুধু বিহারেই থেমে থাকবে না। আগামী বছরগুলোতে অন্যান্য রাজ্যেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি একটি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠতে পারে, যা দেশজুড়ে ভোটাধিকার হরণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে। অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর এখনই সজাগ হওয়া দরকার। তারা যদি রাজ্য পর্যায়ে আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা না গড়ে তোলে, তাহলে তারাও এই ফাঁদে পড়তে পারে।

মানুষের প্রতিরোধ ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা

বিহারের মানুষ এখন আর চুপ করে নেই। পাটনায় ইমারত-ই-শরিয়াহ আয়োজিত একটি সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। যদিও সেই সমাবেশটি ওয়াকফ আইনের বিরোধিতায় ছিল, SIR-এর মতো গুরুতর বিষয়েও একই রকম জনপ্রতিক্রিয়া দরকার। সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজ এখন মানুষকে সচেতন করছে, আইনি সাহায্য দিচ্ছে এবং প্রতিবাদের পথে নামছে। কিন্তু এই লড়াই আরও বড় আকারে ছড়িয়ে দিতে হবে।

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ উঠেছে। তারা কেন এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছে? এর পিছনে কী রাজনৈতিক পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে? এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি সরাসরি হুমকি। সরকারের কাজ মানুষের অধিকার রক্ষা করা, তাদের হরণ করা নয়। কিন্তু এখানে ঠিক উল্টোটা ঘটছে।

কী করা উচিত?

এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মানুষকে একত্রিত হতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে, শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হতে হবে। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি জন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে হবে। এটি শুধু বিহারের লড়াই নয়, এটি গোটা দেশের গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই।

Hot this week

‘ক্ষমা চাও’ – ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে অভিষেককে সময় বেঁধে দিলেন মদন

২১ জুলাইয়ের সভার দিন ফের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে তৃণমূলের...

অফিসের বাথরুমে ঝুলন্ত দেহ, ত্রিপুরার ডিজিপির মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে ধোঁয়াশা

ত্রিপুরার পুলিশ মহলে শোকের ছায়া। সোমবার আগরতলায় পুলিশ সদর...

Topics

‘ক্ষমা চাও’ – ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে অভিষেককে সময় বেঁধে দিলেন মদন

২১ জুলাইয়ের সভার দিন ফের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে তৃণমূলের...

অফিসের বাথরুমে ঝুলন্ত দেহ, ত্রিপুরার ডিজিপির মৃত্যু ঘিরে বাড়ছে ধোঁয়াশা

ত্রিপুরার পুলিশ মহলে শোকের ছায়া। সোমবার আগরতলায় পুলিশ সদর...

‘ঘোর পাপ হয়েছে’—দু’মাস পর নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে মুখ খুললেন মোদি

নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। অনেক...

দশ বছরে সংঘ-ঘনিষ্ঠ ২০ সংস্থাকে ৬৬৮ কোটির বেশি অনুদান! ওএনজিসির সিএসআর তহবিল নিয়ে বিতর্ক

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থাকে সরকারি...

Related Articles

Popular Categories