কেন্দ্রের বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বা মিছিল আয়োজন করাই কোনো ব্যক্তিকে এলাকা-বহিষ্কারের (Externment) কারণ হতে পারে না। এমন পদক্ষেপ নাগরিকের সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে বলে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে বোম্বে হাইকোর্ট।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মাধব জে. জামদারের একক বেঞ্চ ৪৯ বছর বয়সী সাঈদ আহমেদ আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরীর দায়ের করা এক আবেদনের শুনানিতে এই মন্তব্য করে। নিজেকে সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এসডিপিআই)-র সাধারণ সম্পাদক দাবি করা চৌধুরীকে এক বছরের জন্য এলাকা-বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছিল মুম্বই পুলিশ। সেই নির্দেশই আদালত বাতিল করে।
শুনানির সময় আদালত প্রশ্ন তোলে, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বা স্লোগান দেওয়ার জন্য নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা করে কি তাঁদের “সরকারের দাসে” পরিণত করা হচ্ছে? বিচারপতি জামদার বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে এবং কেবল সরকারের সমালোচনা করার কারণে কাউকে এলাকা-বহিষ্কার করা সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করে, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক এফআইআর মূলত বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং “বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ” বা “অমিত শাহ মুর্দাবাদ”-এর মতো রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল। বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের স্লোগান দেওয়ার জন্য কেন একজন নাগরিককে এলাকা-বহিষ্কারের মতো কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে।
শুনানির সময় বিচারপতি জামদার পুলিশকেও সতর্ক করে বলেন, পুলিশ জনগণের সেবক, সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নয়। তিনি আরও মন্তব্য করেন, নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
চৌধুরী ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর মুম্বই পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (জোন-৬, চেম্বুর)-এর জারি করা এলাকা-বহিষ্কারের আদেশকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁর দাবি ছিল, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া এফআইআরের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর ফলে তিনি স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।
আবেদনকারীর আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সমস্ত মামলাই ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারায় নথিভুক্ত হয়েছিল, যা সরকারি আদেশ অমান্যের অভিযোগ সংক্রান্ত। এসব মামলা মূলত সিএএ, এনআরসি, বাবরি মসজিদ এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে আয়োজিত বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তাঁদের দাবি, মহারাষ্ট্র পুলিশ আইনের ৫৬ ধারা প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন এমন প্রমাণ, যাতে বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জননিরাপত্তা বা সম্পত্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু আবেদনকারীর বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ বা প্রমাণ ছিল না।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন, আবেদনকারী ও অন্য বিক্ষোভকারীরা পুলিশের অনুমতি ছাড়াই কর্মসূচি পালন করেছিলেন এবং কিছু বিতর্কিত স্লোগানও দিয়েছিলেন। সেই কারণেই পুলিশের পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল বলে সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়।
তবে আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করেনি। বিচারপতি জামদার রায়ে বলেন, নথিপত্রে এমন কোনো প্রমাণ নেই, যা থেকে বোঝা যায় আবেদনকারীর কার্যকলাপের ফলে ব্যক্তি বা সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শুধুমাত্র আইপিসির ১৮৮ ধারার মামলার ভিত্তিতে মহারাষ্ট্র পুলিশ আইনের অধীনে এলাকা-বহিষ্কারের নির্দেশ জারি করা যায় না বলেও আদালত স্পষ্ট করে।
রায়ে আরও বলা হয়, এলাকা-বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা একটি অসাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ, যা একজন নাগরিকের অবাধ চলাফেরা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকারকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য কারণ থাকা আবশ্যক।
শেষ পর্যন্ত বোম্বে হাইকোর্ট মুম্বই পুলিশের এলাকা-বহিষ্কারের নির্দেশকে “ত্রুটিপূর্ণ” ও “বিদ্বেষমূলক” বলে অভিহিত করে তা বাতিল করে দেয়। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু নীতির বিরোধিতা করে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে আবেদনকারীর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সংবিধানের ১৯ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত বাক্স্বাধীনতা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।


