ইজরায়েলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিরোধিতায় আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে চলেছেন ভারতীয় বন্দর শ্রমিকরা। আগামী ৩০ অক্টোবর ‘যুদ্ধ ও বন্দরের সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (WTWFI)। ফেডারেশনের ঘোষণা অনুযায়ী, ভারতের ১৫টি বন্দরে এই কর্মসূচি পালিত হবে। ‘নো হারবার ফর জেনোসাইড’ নামে আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ।
‘ডকশ্রমিকরা যুদ্ধের জন্য কাজ করে না’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত কর্মসূচিতে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন বন্দরের শ্রমিক সংগঠনগুলি অংশ নেবে বলে আয়োজকদের দাবি। ইজরায়েলে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণে বেসামরিক বন্দর ব্যবহারের বিরোধিতা করাই এই প্রচারাভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি ইজরায়েলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে আন্তর্জাতিক স্তরে চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (CITU)-এর সঙ্গে যুক্ত WTWFI এই কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছে। ফেডারেশনটি ইস্তাম্বুল ঘোষণাপত্রেরও সমর্থক। ওই ঘোষণাপত্রে ফিলিস্তিনে যুদ্ধের অবসান, বন্দর দিয়ে অস্ত্র পরিবহণ বন্ধ এবং বেসামরিক বন্দর অবকাঠামোকে সামরিক কাজে ব্যবহারের বিরোধিতা-সহ একাধিক দাবি তুলে ধরা হয়েছে বলে আয়োজকদের বক্তব্য।
গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং সেই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ ওঠা আন্তর্জাতিক সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, কর্মী ও অধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ও শিপিং সংস্থাগুলির উপর চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যেই ৩০ অক্টোবরের কর্মসূচি বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। তাঁদের দাবি, ফিলিস্তিনে যুদ্ধের অবসানের পাশাপাশি অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বন্ধ, বন্দর দিয়ে অস্ত্রের চালান বন্ধ এবং বেসামরিক বন্দরকে সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করার বিরোধিতা করতে হবে।
শুধু যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নয়, শ্রমিকদের আর্থিক ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত দাবিও এই কর্মসূচির অন্যতম অংশ। ইউনিয়নগুলির দাবি, সামরিক খাতে বিপুল সরকারি ব্যয়ের পরিবর্তে স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। চাকরি কমানো ও শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করার জন্য অটোমেশন ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছে সংগঠনগুলি।
ইজরায়েলের উদ্দেশে পাঠানো সামরিক পণ্য ওঠানো-নামানোর বিরোধিতায় WTWFI-এর এই প্রথম উদ্যোগ নয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেশনটি জানিয়েছিল, তাদের সদস্যরা ইজরায়েলের জন্য নির্দিষ্ট অস্ত্র ও ফিলিস্তিনের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত সামরিক সরঞ্জাম লোড বা আনলোড করতে অস্বীকার করবেন। সেই সময় ফেডারেশনের দাবি ছিল, ভারতের ১১টি প্রধান বন্দরে কর্মরত ৩,৫০০-এরও বেশি শ্রমিক তাদের প্রতিনিধিত্বে রয়েছেন।
এবার ১৫টি বন্দরে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ঘোষণাকে সেই অবস্থানের সম্প্রসারণ হিসেবেই দেখছে সংগঠনটি। বাণিজ্যিক বন্দর দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণের বিরোধিতায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে ভারতীয় শ্রমিকদের সমন্বয় বাড়ানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক কর্মসূচির আয়োজকদের প্রকাশিত একটি নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে স্পেন, গ্রিস, তুরস্ক ও ইতালিতে বন্দর শ্রমিকদের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে ভারতীয় সামরিক ইস্পাতের ২৩টি কন্টেইনার ইতালিতে আটক করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। নথিতে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে স্পেনের বন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, গ্রিসে মাল খালাসে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং তুরস্ক থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।
আয়োজকদের দাবি, ওই ইস্পাত দিয়ে প্রায় ১৩ হাজার ১৫৫ মিলিমিটার আর্টিলারি শেল তৈরি করা সম্ভব ছিল। তবে এই বিবরণ ও পরিসংখ্যান আয়োজকদের প্রকাশিত নথির উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে; স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে সেগুলিকে বিবেচনা করা উচিত নয়।
৩০ অক্টোবরের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বন্দরগুলিতে সমন্বিত ধর্মঘট ও অন্যান্য শ্রমিক কর্মসূচির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। রোমে ১৫ অক্টোবরের এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত নথিতে অনুমান করা হয়েছে, কর্মসূচির জেরে প্রায় ৪০ হাজার কন্টেইনার এক দিনের জন্য আটকে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য পরিবহণে বিলম্ব হতে পারে বলে তাদের দাবি।
আয়োজকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কন্টেইনারে আনুমানিক ৫৪ হাজার ডলারের পণ্যমূল্য ধরে এই অনুমান করা হয়েছে। তাঁদের আরও দাবি, এক দিনের বিলম্বের আর্থিক প্রভাব ৪৩ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এগুলি আয়োজকদের করা পূর্বাভাস, কর্মসূচির প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাবের স্বাধীনভাবে যাচাই করা হিসাব নয়।
এই আন্দোলন আগের আন্তর্জাতিক বন্দর শ্রমিক কর্মসূচিগুলির ধারাবাহিকতা বলেও দাবি করা হয়েছে। আয়োজকদের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতটি দেশের ২০টিরও বেশি বন্দরের শ্রমিকদের অংশগ্রহণে একটি কর্মসূচি হয়েছিল। সেই সময় এক দিনে পাঁচটি সন্দেহভাজন জাহাজের চলাচল আটকে দেওয়ার দাবি করেছে আয়োজকপক্ষ।
অন্যদিকে, সামরিক পণ্য পরিবহণে অস্বীকৃতি জানানো শ্রমিকদের বরখাস্ত, মামলা ও অন্যান্য চাপের মুখে পড়তে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে ইউনিয়নগুলি। তাদের বক্তব্য, বন্দর শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, যৌথ দরকষাকষির অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা এবং অটোমেশনের কারণে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কার মতো বিষয়গুলিও এই আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
এদিকে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ‘নো হারবার ফর জেনোসাইড’ প্রচারাভিযান এলবিট সিস্টেমসের জন্য যন্ত্রাংশের ৩১৫টি চালানের উপর নজর রেখেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রচারাভিযান। সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর নজরদারি এবং বন্দর শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ বলে দাবি সংগঠকদের।
সব মিলিয়ে, ৩০ অক্টোবরের কর্মসূচির মাধ্যমে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামরিক সরবরাহ এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে চাপ বাড়াতে চাইছে বিভিন্ন বন্দর শ্রমিক সংগঠন। ভারতের ১৫টি বন্দরে ঘোষিত এই কর্মসূচি বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হয় এবং পণ্য পরিবহণে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।


