Saturday, October 24, 2026
26 C
Kolkata

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার গর্ব! তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অস্কার ক্লেইন পদক পেলেন কলকাতার গাজা ইস্যুতে সরব হওয়া অশোক সেন

স্ট্রিং থিওরি নিয়ে গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি। প্রথম ভারতীয় পদার্থবিদ হিসেবে এই সম্মান পেলেন অশোক সেন। ডিরাক মেডেল, ব্রেকথ্রু প্রাইজের পর তাঁর মুকুটে নয়া পালক।

ফের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উজ্জ্বল ভারতের নাম। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অস্কার ক্লেইন পদক (Oskar Klein Medal) পেলেন বিশিষ্ট ভারতীয় বিজ্ঞানী অশোক সেন (Ashoke Sen)। এই প্রথম কোনও ভারতীয় পদার্থবিদের হাতে উঠল এই সম্মান। আর এই সাফল্যে দেশের পাশাপাশি গর্বিত বাংলা। কারণ, এই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর জন্ম কলকাতায়। এই শহরেই তাঁর বিজ্ঞানচর্চার প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে আন্তর্জাতিক গবেষণার জগতে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে।

১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয় অস্কার ক্লেইন পদক। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্সের সঙ্গে যুক্ত এই সম্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার জগতে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। স্ট্রিং থিওরি নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণার সুবাদে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে বিশেষ পরিচিত অশোক সেন। এর আগে তিনি পেয়েছেন ডিরাক মেডেল এবং মৌলিক পদার্থবিদ্যায় ব্রেকথ্রু প্রাইজ। এবার অস্কার ক্লেইন পদক তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হয়ে উঠল।

আধুনিক পদার্থবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র হল স্ট্রিং থিওরি। এই তত্ত্বের মাধ্যমে মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান এবং প্রকৃতির বিভিন্ন বলকে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও মহাকর্ষের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রিং থিওরির বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধানে অশোক সেনের গবেষণা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।

তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান এস-ডুয়ালিটি (S-duality) নিয়ে গবেষণা। এই ধারণা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় শক্তিশালী ও দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে। তাঁর গবেষণার প্রভাব আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে বিশেষভাবে স্বীকৃত।

এই সম্মান গ্রহণের অংশ হিসেবে গত ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন অশোক সেন। তাঁর বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘গ্র্যাভিটি ফ্রম স্ট্রিংস অ্যান্ড স্ট্রিংস ফ্রম গ্র্যাভিটি’ (Gravity from Strings and Strings from Gravity)। বক্তৃতায় স্ট্রিং থিওরি ও মহাকর্ষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন তিনি।

১৯৫৬ সালের ১৫ জুলাই কলকাতায় জন্ম অশোক সেনের। তাঁর বাবা অনিলকুমার সেন ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। মা গৌরী সেন ছিলেন গৃহবধূ। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে ওঠা অশোকের বিজ্ঞানচর্চার ভিত তৈরি হয়েছিল কলকাতাতেই।

শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যাপীঠ থেকে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ১৯৭৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন তিনি। এরপর ১৯৭৬ সালে কানপুর আইআইটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার স্টনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় বিশিষ্ট পদার্থবিদ অমলকুমার রায়চৌধুরীর কাজ ও শিক্ষাদান তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে আমেরিকার ফার্মিল্যাব এবং স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর সেন্টারে কাজ করেন অশোক সেন। ১৯৮৮ সালে মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে (TIFR) যোগ দেন তিনি। ১৯৯৭ সালে প্রয়াগরাজের হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (NISER) এবং আইআইএসইআর ভোপালের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

বর্তমানে বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্সেসে (ICTS) ICTS-ইনফোসিস মাধব চেয়ার প্রফেসর হিসেবে কর্মরত অশোক সেন। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক স্তরে বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বিজ্ঞানচর্চায় অবদানের জন্য দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশ-বিদেশের একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন অশোক সেন। ১৯৮৯ সালে পান আইসিটিপি পুরস্কার। ১৯৯৪ সালে সম্মানিত হন শান্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কারে। ১৯৯৭ সালে পান টিডব্লিউএএস পুরস্কার। ১৯৯৮ সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন তিনি।

২০০১ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে ভারত সরকার। ২০০৯ সালে পান ইনফোসিস প্রাইজ ইন ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেস। ২০১২ সালে মৌলিক পদার্থবিদ্যায় ব্রেকথ্রু প্রাইজ পান তিনি। স্ট্রিং থিওরির বিভিন্ন রূপের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর সন্ধানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি ছিল এই পুরস্কার। ২০১৩ সালে পান পদ্মভূষণ এবং ২০১৪ সালে ডিরাক মেডেল।

এবার ২০২৬ সালে অস্কার ক্লেইন পদক প্রাপ্তি তাঁর সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যোগ করল। কলকাতার শিক্ষাঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমঞ্চ—অশোক সেনের এই দীর্ঘ যাত্রা ফের মনে করিয়ে দিল, মৌলিক গবেষণায় ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে। একই সঙ্গে এই সাফল্য বাংলার বিজ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এল।

Hot this week

আদিবাসীদের চিকিৎসা করতে ওড়িশায় গিয়েছিলেন, খনিবিরোধী আন্দোলনে যোগের অভিযোগে আজ জেলবন্দি চিকিৎসক!

ওড়িশায় আদিবাসী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার...

জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তের ভারও জ্ঞানেশের হাতেই!’ আরটিআইয়ে অস্বস্তিতে কেন্দ্রের ভূমিকা

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের...

বুকস্টল ভাঙার পরেও এত বই বিক্রি! বামেদের কটাক্ষ রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর

বুকস্টলে হামলার অভিযোগ এবং রেকর্ড বই বিক্রির দাবি—বামেদের দুই...

Topics

আদিবাসীদের চিকিৎসা করতে ওড়িশায় গিয়েছিলেন, খনিবিরোধী আন্দোলনে যোগের অভিযোগে আজ জেলবন্দি চিকিৎসক!

ওড়িশায় আদিবাসী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার...

জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তের ভারও জ্ঞানেশের হাতেই!’ আরটিআইয়ে অস্বস্তিতে কেন্দ্রের ভূমিকা

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের...

বুকস্টল ভাঙার পরেও এত বই বিক্রি! বামেদের কটাক্ষ রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর

বুকস্টলে হামলার অভিযোগ এবং রেকর্ড বই বিক্রির দাবি—বামেদের দুই...

Related Articles

Popular Categories