22 C
Kolkata
Saturday, November 27, 2021

তথ্য সন্ত্রাস ও হলুদ সাংবাদিকতার কবলে ভারতীয় মুসলিম সমাজ

Must read

গণমাধ্যমের মাথায় বহুল প্রচলিত একটি বিষয় জেঁকে বসেছে যার নাম ‘তথ্য সন্ত্রাস’। তথ্য সন্ত্রাস মানে মিথ্যা তথ্যের দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করা। কোনো কায়েমী গোষ্ঠীর দ্বারা সাম্প্রদায়িক বা অন্য যে কোন হীনস্বার্থে মিথ্যা, বানোয়াট, অতিরঞ্জিত ও উদ্দেশ্যমূলক তথ্য বা মিডিয়া প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে হিংসা, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছড়িয়ে, শ্রেণী সম্প্রদায় বা জাতিগত হানাহানি সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করাকে তথ্য সন্ত্রাসের পর্যায়ভুক্ত করা যায় । তথ্য সন্ত্রাস ও হলুদ সাংবাদিকতা প্রায় একে অপরের সমার্থক।

আধুনিক বিশ্বে তথ্য সন্ত্রাসের আরেক নতুন রূপ হলুদ সাংবাদিকতা। তথ্য পরিবেশনের চেয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচারের দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করাই হল হলুদ সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য। বর্তমানে হলুদ সাংবাদিকতার উপর ভর করে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান টার্গেটই হল ‘ইসলাম-বিদ্বেষ।’ বর্তমান বিশ্বে তা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে মুলমানদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে। বলতে গেলে তথ্য সন্ত্রাস ও হলুদ সাংবাদিকতা বিশ্বব্যাপী মিডিয়া জগতে একটি কালো ছোবল।
ভারতীয় মিডিয়াও তথ্য সন্ত্রাস ও হলুদ সাংবাদিকতার দ্বারা ব্যাপক ভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতা করতে হলে যোগ্যতা নিরূপণের মাপকাঠিই বা কি এর উত্তর চাওয়ার ও পাওয়ার কোন সুযোগ আপাতত আমাদের দেশে নেই। ভারতীয় মিডিয়াকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে মনে করা হয়, কিন্তু সেই মিডিয়া বিশেষ বিশেষ অশুভ শক্তির দ্বারা এমন ভাবে নিয়ন্ত্রিত যে মিডিয়ার কার্যকলাপে ভারতীয় গণতন্ত্র আজ ধুকে ধুকে মরছে। জনগণের অধিকার নিয়ে সরকারকে প্রশ্ন না করে সরকারের চাটুকদারি করা। সরকারের ভুল গুলিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য গুরুত্বহীন বিষয়গুলি দিয়ে ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া গুলিকে ব্যস্ত করে রাখা। কায়েমী গোষ্ঠীর স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য বিগত কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার সৃজনশীল মুসলিম যুবকদের নামে ভূল তথ্য প্রচার করে তাদের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে মহারাষ্ট্র পুলিশ ১১ জনকে গ্রেফতার করে। জামিল আহমেদ খান, মোহাম্মদ ইউনুস, ইউসুফ খান, ওয়াসিম আরিফ, আয়ুব ইসমাইল খান, সেখ সাফি, ফারুক আহমেদ খান, আব্দুল কাদের হাবিবি, সৈয়দ আসফাক মির, মুমতাজ মোর্তাজা মির ও হারুন আনসারি। এদের মধ্যে কয়েক জন ডাক্তার, কয়েক জন ইঞ্জিনিয়ার, ১ জন গবেষণারত ছাত্র। দেশজুড়ে সংবাদপত্রে হেডলাইন হল এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হল যে ‘শিক্ষিত মুসলিমরা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিশোধ নিতে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিচ্ছে’। ২৫ বছর পর ২০১৯ সালে এরা সকলেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।

নিসার উদ্দিন আহমেদ, ১৯ বছর বয়সী কর্ণাটকের এক স্টুডেন্ট, ১৯৯৪ সালে একদিন কলেজে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়ে যায়, কিছুদিন পরে জানা যায় যে তাকে হায়দ্রাবাদ পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে সিরিয়াল ব্লাস্টে যুক্ত থাকার অভিযোগে। এরপর তার দাদা জাহির ও প্রতিবেশী মোহাম্মদ ইউসুফ কেউ একই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। অবশেষে ২৩ বছর জেলে থাকার পর আদালতে তারা নির্দোষ প্রমানিত হলেন।
১৯৯৮ সালে ১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আমির খান মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে যাচ্ছিল। পথে দিল্লি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে ৪ দিন টানা টর্চার করে ৫০০টি সাদা কাগজে সই করিয়ে নেয় ও তাকে টেররিস্ট প্ল্যানিং এ অভিযুক্ত করে। ১৪ বছর জেল খাটার পর তিনি নির্দোষ প্রমানিত হয়েছেন। দিল্লি সরকার তাকে মাত্র ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে দায় সেরেছে।

শ্রীনগরের ১৭ বছর বয়সী মকবুল শাহ, লাজপথ নগর ব্লাস্টে অভিযুক্ত হয়ে ১৪ বছর জেলে থাকার পরে নির্দোষ প্রমাণিত হয়। দিল্লির ট্যাক্সি ড্রাইভার ইরশাদ আলি, টেররিস্ট সংগঠন আল-বদরের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে ২০০৫ সালে গ্রেফতার হয়। ১০ বছর পরে জানা যায় যে তাকে পুলিশ ইনফর্মার হওয়ার জন্য জবরদস্তি করে, কিন্তু তিনি পুলিশের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তার প্রতি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়।

২০০৬ মালেগাঁও বিস্ফোরণে মুম্বই পুলিশ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। নুরুল হুদা, সাব্বির আহমেদ, রইস আহমেদ, সালমান ফারসি, ইকবাল আহমেদ, মোহাম্মদ আলী, আসিফ খান, মোহাম্মদ জাহিদ ও আবরার আহমেদ। ১০ বছর পর এরা নির্দোষ প্রমানিত হয়েছেন। কর্ণাটকের সাব্বির গঙ্গাওয়ালি ২০০৮ সালে মুম্বই হামলায় অভিযুক্ত হয়ে ৮ বছর জেল খাটার পর নির্দোষ প্রমাণ হয়েছেন। ব্যাঙ্গালোরের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ইয়াহিয়া ২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদী হিসেবে জেলবন্দি থাকার পর আদালতে নির্দোষ প্রমাণ হন।

২০১২ সালের ১৭ জুলাই বাড়ি থেকে এক দল লোক সিভিল ড্রেসে এসে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় গার্ডেনরিচ মেটিআব্রুজের লিদিপাড়ার বাসিন্দা মুহাম্মদ হারুন রশিদ কে। তার সামনেই নেট থেকে কাগজ প্রিন্ট করে অনেক সাদা কাগজে সই করিয়ে নেয় পুলিশ। মুহাম্মদ হারুন রশিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলাও ছিল। বিভিন্ন জেহাদী কাজে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু কোর্টে সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে ২০১৮ সালের ১৮ই মার্চ তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। মিডিয়ায় তাঁকে ‘জঙ্গি’ বলে প্রচার করা হয়েছে। সেই সময় কোন অঘটন ঘটলেই গোয়েন্দা সূত্র বা ওই ধরণের সূত্র দিয়ে মেটিআব্রুজের হারুন রশিদের নাম জুড়ে খবর হত। কিন্তু তিনি মুক্ত হবার পর সেই সব মিডিয়া আর কোন খবর করে নি।

নির্দোষ প্রমাণ হওয়ার এই রকম কয়েকশো উদাহরণ রয়েছে। এখনও হাজার হাজার এমন অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচারের আওতায় জেলে পচে মরছে। এরা যখন গ্রেফতার হয়েছে তখন গোটা দেশেজুড়ে সব সংবাদমাধ্যমে এদের ব্যাপারে উদ্দেশ্যমূলক ভুল তথ্য এত বেশি প্রচার করা হয়েছে বা জঙ্গি বলে দেখানো হয়েছে যে নির্দোষ প্রমাণ হওয়ার পরেও তারা বাকি জীবনটা স্বাভাবিক ভাবে পরিচালনা করতে অক্ষম হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে ঘটে যাওয়া দিল্লী দাঙ্গার পর বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে সরকার যে ভাবে আইনের আওতায় নিয়ে এসে হয়রানি করছে সেখানে মিডিয়াও সমানতালে সরকারের সঙ্গে তথ্য সন্ত্রাস করে চলেছে।

ঠিক তেমনি এই মুহুর্তে মিডিয়া মেতেছে এনআইএ কর্তৃক সন্ত্রাস সন্দেহে ধৃত মুর্শিদাবাদের ৯ জন মুসলিম যুবকের ব্যাপারে বানোয়াট ও হাস্যকর খবর ছড়াতে। কোন ব্যক্তি দেশদ্রোহিতার কাজে যুক্ত থাকলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই হতে হবে এবং তার জন্য আইন আছে, আদালত আছে। তাকে সন্ত্রাসী প্রমান করার দায়িত্ব কি মিডিয়ার? এবং সেটা প্রমান করার জন্য কি মিডিয়া যা ইচ্ছে তাই বলতে পারে? যে মিডিয়া ধৃত ব্যক্তির বাড়ির বাথরুমের চেম্বারকে সন্ত্রাসী কার্যের সুড়ঙ্গ বলে চালানোর চেষ্টা করে তাদের নিকট আমরা কি আশা করতে পারি? এদের দ্বারা গণতন্ত্র বাঁচবে? গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে এদের হাত থেকে বাঁচানো যাবে তো?

লেখক:
মাফিকুল ইসলাম
হরিহরপাড়া, মুর্শিদাবাদ

- Advertisement -spot_img

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

Latest article