পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারি স্কুলের মিড-দে মিল, ঘিরে এক গভীর সংকটের ছবি সামনে আসছে। বহু জায়গায় খাবারের মান খারাপ, পরিমাণ কম, আবার কোথাও শিক্ষক না থাকায় ক্লাস ও খাবার দুটোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কলকাতার উপকণ্ঠ উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুর নিউ কলোনি স্কুলে গেলে এই সমস্যার স্পষ্ট চিত্র দেখা যায়। দুইতলা ভবন থাকা সত্ত্বেও সেখানে পড়ুয়া সংখ্যা হাতে গোনা। মাত্র কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে চলছে ক্লাস। একই স্কুল ভবনের একাধিক ঘর অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। কোথাও ‘মা ক্যান্টিন’, আবার কোথাও অঙ্গনওয়াড়ির রান্নাঘর। ফলে পড়াশোনা ও মিড-ডে মিল,দুটোই প্রভাবিত হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের গঙ্গারামপুরের একটি প্রাথমিক স্কুলেও একই ছবি। সেখানে প্রায় তিন ডজন ছাত্রছাত্রীর জন্য খুব অল্প পরিমাণ ডাল দিয়ে রান্না করা হয়। রান্নার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কথায়, এত কম উপকরণ দিয়ে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব নয়। তবুও দরিদ্র পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা ক্ষুধার তাড়নায় সেই খাবারই খেয়ে নেয়।
এই প্রকল্পে প্রতি ছাত্রছাত্রীর জন্য যে টাকা বরাদ্দ করা হয়, তা দিয়ে মানসম্মত খাবার দেওয়া কঠিন বলেই মনে করছেন কর্মীরা। রান্নার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মী জানান, “ছাত্রছাত্রীরা আমাদের নিজের সন্তানের মতো। তাদের এই অবস্থায় দেখে খারাপ লাগে, কিন্তু কিছু করার নেই।” অন্যদিকে, এই প্রকল্পে যুক্ত কর্মীরাও দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে চলেছেন। তাঁদের মাসিক ভাতা খুবই কম। তাঁরা বেতন বৃদ্ধি, স্থায়ী চাকরি, পেনশনসহ নানা দাবিতে সরব হয়েছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই দাবিগুলি পূরণ হয়নি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক হলেও বাস্তবে অনেকেই নিয়মিত খাবার পাচ্ছে না। গত কয়েক বছরে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনই কমেছে প্রকল্পের আওতায় আসা শিশুদের সংখ্যাও। এর ফলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং স্কুলে তাদের উপস্থিতি বাড়ানো। একসময় তা সফলও হয়েছিল। কিন্তু এখন নানা সমস্যার কারণে সেই লক্ষ্য অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, খরচের হিসাব নিয়েও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পর্যালোচনায় রাজ্যের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এর জেরে আর্থিক বরাদ্দেও প্রভাব পড়েছে। যদিও রাজ্যের তরফে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে বহু স্কুলে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা ভিন্ন কথা বলছে। অনেক শিশু আজও একটি ডিমের অপেক্ষায় থাকে, যা সপ্তাহে একদিন মেলে। পশ্চিমবঙ্গের মিড-ডে মিল প্রকল্পে দ্রুত সংস্কার ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। না হলে ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রকল্প আরও সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


