অযোধ্যার গলিপথে এক সাধারণ সাইকেল মিস্ত্রী, যার হাতে সাইকেলের চাকা ঠিক হয়, সেই হাতেই আজ ৪৫,০০০-এরও বেশি বেওয়ারিশ মৃতদেহ অন্তিম বিদায় পেয়েছে। তিনি মহম্মদ শরীফ, তবে গোটা ভারতবর্ষ তাকে চেনে ‘শরীফ চাচা’ নামে। এই ৮৩ বছরের বৃদ্ধ মানুষটির জীবন গল্প শুধু অযোধ্যার নয়, সমগ্র মানবতার গর্বের এক অধ্যায়।
তার জীবনের এই অসাধারণ যাত্রা শুরু হয়েছিল এক গভীর বেদনার মধ্য দিয়ে। ১৯৯২ সালে তার বড় ছেলে রইস এক মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারান। ছেলের দেহ কয়েকদিন ধরে বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়ে থাকে, কেউ এগিয়ে আসে না, কেউ দায়িত্ব নেয় না। শেষে পরিবার এসে ইসলামি রীতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। সেই শোকের মুহূর্তে শরীফ চাচা ভেঙে পড়েননি, বরং এক অভূতপূর্ব সংকল্প নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ঠিক করেছিলেন, আর কোনও মৃতদেহ যেন তার ছেলের মতো অসহায়ভাবে পড়ে না থাকে। সেদিন থেকে শুরু হয় তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
শরীফ চাচা প্রতিদিন সকালে তার ছোট্ট সাইকেলের দোকান থেকে বেরিয়ে পড়েন। থানা, হাসপাতাল, রেলস্টেশন কিংবা মর্গ—যেখানে বেওয়ারিশ লাশের খবর পান, সেখানেই ছুটে যান। পুলিশ তিনদিন অপেক্ষা করে, কেউ দাবি না করলে লাশ তার হাতে তুলে দেয়। তিনি কোনও ধর্মের ভেদাভেদ করেন না। হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, শিখ বা খ্রিস্টান—প্রতিটি মৃতদেহের শেষকৃত্য তিনি সেই ধর্মের রীতি মেনেই সম্পন্ন করেন। গত ২৫-৩০ বছরে তিনি এভাবে হাজার হাজার লাশের শেষ বিদায়ের দায়িত্ব নিয়েছেন।
এই কাজের জন্য তার কাছে কোনও সরকারি সাহায্য আসে না। সাইকেল মেরামতের সামান্য আয় আর স্থানীয় দোকানদারদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা দানই তার ভরসা। দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও তিনি কখনও পিছপা হননি। শরীরে বয়সের ছাপ পড়েছে, অসুখ এসেছে, তবু তার মনের জোর অটুট। তিনি বলেন, “আমি শুধু চাই, কেউ যেন আমার ছেলের মতো অবহেলিত না হয়। এই কাজে আমি শান্তি পাই।”
তার এই নিঃস্বার্থ সেবার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা করে। মহামারীর কারণে পুরস্কার গ্রহণ করতে একটু দেরি হয়, ২০২১ সালে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের হাত থেকে তিনি এই সম্মান গ্রহণ করেন। এই পুরস্কার শুধু তার নয়, সেই সব অজানা মানুষের প্রতিও সম্মান, যাদের শেষ যাত্রায় শরীফ চাচা একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছেন।
শরীফ চাচার জীবন আমাদের শেখায়, মানবতার কাছে ধর্ম বা জাত কোনও বাধা নয়। তিনি বলেন, “অযোধ্যায় আমার কাছে হিন্দু-মুসলিম নেই, শুধু মানুষ আছে।” তার এই কথা আর কাজ আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। তিনি যে শুধু অযোধ্যার গর্ব নন, গোটা ভারতের, বরং বিশ্বের কাছেও তিনি এক অনুপ্রেরণা।
শরীফ চাচা আমাদের সমাজের সেই নায়ক, যিনি নিজের জীবনের শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে হাজারো মানুষের শেষ যাত্রায় আলো হয়ে উঠেছেন। ভালো থাকুন চাচা। আপনার মতো মানুষের জন্যই এই সমাজ এখনও টিকে আছে। আপনি আমাদের পদ্মশ্রী, আমাদের গর্ব।


