দেশজুড়ে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কাণ্ড ঘিরে বাড়ছে ক্ষোভ ও উদ্বেগ। এই বিতর্কের মধ্যেই একের পর এক পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, পরীক্ষাব্যবস্থার ভাঙনের জেরে মানসিক চাপে পড়ে আত্মঘাতী হচ্ছে পড়ুয়ারা। কংগ্রেসের দাবি, এখনও পর্যন্ত অন্তত চার জন পরীক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, এই মৃত্যুগুলি শুধুই আত্মহত্যা নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল।
সম্প্রতি গোয়া থেকে এক ১৭ বছরের ছাত্রের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। মৃত ছাত্র সিদ্ধার্থ হেগড়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল বলে পরিবারের দাবি। অভিযোগ, নিট পরীক্ষা বাতিল হওয়া এবং প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। তার ঘর থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে। সেখানে সে লিখে গিয়েছে, গত দু’বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করার পর আবার নতুন করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মানসিক শক্তি তার আর অবশিষ্ট ছিল না।
এর আগেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অংশিকা পাণ্ডে, ঋত্বিক মিশ্র এবং প্রদীপ মেঘওয়াল নামে আরও তিন পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারগুলির দাবি, নিট কেলেঙ্কারির পর থেকেই তাঁরা গভীর অবসাদে ভুগছিলেন। এই ঘটনাগুলিকে সামনে এনে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে কংগ্রেস। দলের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দাবি করা হয়েছে, এই মৃত্যুগুলি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে হওয়া “প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা”।
প্রশ্নফাঁস বিতর্কে শুরু থেকেই কেন্দ্রকে আক্রমণ করে আসছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, গত বছরও পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়ম সামনে এসেছিল, কিন্তু তখন কোনও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এবারও একই ঘটনা ঘটলেও সরকার দায় এড়াতে চাইছে। সামাজিক মাধ্যমে করা এক পোস্টে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, কেন বারবার পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হচ্ছে এবং কেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে এখনও সরানো হয়নি।
এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান-এর পদত্যাগের দাবিও তুলেছে কংগ্রেস। বিরোধীদের বক্তব্য, এত বড় পরীক্ষায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্র। যদিও শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পরীক্ষামাফিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দোষীদের কাউকে ছাড়া হবে না।
গত ৩ মে জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা বা এনটিএ প্রায় ২৩ লক্ষ পরীক্ষার্থীর জন্য নিট-ইউজি পরীক্ষা আয়োজন করেছিল। পরে অভিযোগ ওঠে, পরীক্ষার অনেক আগেই কিছু ছাত্রছাত্রীর হাতে সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র পৌঁছে গিয়েছিল। তদন্তে জানা যায়, ফাঁস হওয়া প্রশ্নের মধ্যে বহু প্রশ্ন মূল পরীক্ষার সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছে। শুধু প্রশ্ন নয়, উত্তর বিকল্পও এক ছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের।
ঘটনার তদন্তে নেমে সিবিআই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে পেয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকজন অধ্যাপক ও শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, প্রশ্ন তৈরির দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের মাধ্যমেই তথ্য বাইরে পাচার হয়েছিল। এক অধ্যাপিকার নামও সামনে এসেছে, যিনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। নিট কাণ্ড এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। একদিকে পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে মৃত্যুর পর পর ঘটনা— সব মিলিয়ে কেন্দ্রের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।


