সরকারি অনুষ্ঠানের শুরুতেই রাজ্যের গান ‘তামিল থাই ভাজথু’ গাওয়াকে বাধ্যতামূলক করার পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব পাশ হল তামিলনাড়ু বিধানসভায়। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর সরকার কোনও আপস করবে না।
বিধানসভায় প্রস্তাবটি পেশ করে বিজয় বলেন, তামিলনাড়ুর সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে রাজ্যের গানকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য, ‘‘তামিল কেবল একটি ভাষা নয়, বরং আমাদের জীবনরেখা ও আবেগের বিষয়।’’ মাতৃভাষাকে মাতৃত্বের মতোই পবিত্র বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘তামিল মানেই গর্ব, তামিল মানেই শক্তি। ‘তামিল’ শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র তামিলনাড়ু ঐক্যবদ্ধ হয়ে এক কাতারে দাঁড়াবে। তামিলনাড়ুতে ‘তামিল থাই ভাজথু’-কেই প্রথম স্থান দিতে হবে। এটি প্রথমে রাখা আমাদের অধিকার।’’
প্রস্তাবটি ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-সহ বিভিন্ন দলের সমর্থন পায়। বিধানসভার স্পিকার জেসিডি প্রভাকর প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হওয়ার কথা ঘোষণা করেন। প্রস্তাবটি কার্যকর করতে আর কোনও অনুমতির প্রয়োজন নেই বলেও জানান তিনি।
বিধানসভার প্রস্তাব অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি দফতর এবং সরকারি খাতের সংস্থাগুলিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও প্রথমে ‘তামিল থাই ভাজথু’ গাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশের সঙ্গে কার্যত সংঘাতের বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ এবং তার পরে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছিল। জুলাইয়ে জারি করা আরও একটি নির্দেশিকায় রাজ্যগুলিকে ওই নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়।
৯ জুলাইয়ের নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, কোনও অনুষ্ঠানে জাতীয় গান বা জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে রাজ্যের গানও গাওয়া বা বাজানো হলে প্রথমে জাতীয় গান এবং তার পরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করতে হবে। তামিলনাড়ুতে সরকারি অনুষ্ঠানে ‘তামিল থাই ভাজথু’ গাওয়ার রীতি নতুন নয়। ১৯৭০ সালেই সরকারি অনুষ্ঠানে গানটি গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এরপর থেকেই সরকারি অনুষ্ঠানের শুরুতে গানটি পরিবেশনের রীতি চলে আসছে। ২০২১ সালে ‘তামিল থাই ভাজথু’-কে আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলনাড়ুর রাজ্য গান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই গানটির পরিবেশনের ক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মে মাসে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীতের পর তৃতীয় স্থানে ‘তামিল থাই ভাজথু’ পরিবেশন করা হয়েছিল। তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়।
এর কয়েক সপ্তাহ পর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের দলের ২৩ জন বিধায়ক মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে গানটির স্থান ফের তৃতীয় করা হয়। টিভিকে-র দাবি ছিল, রাজ্যপালের কার্যালয় থেকেই ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এই বিতর্কের মধ্যেই সম্প্রতি তামিলনাড়ুর ২১ জন সাংসদ রাজ্যপালকে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, রাজ্যের সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে প্রথমে ‘তামিল থাই ভাজথু’ এবং সবশেষে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হোক।
এবার বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব পাশ হওয়ায় বিষয়টি নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেল। একদিকে কেন্দ্রের নির্দেশ, অন্যদিকে রাজ্যের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি—এই দুই অবস্থানের সংঘাত আগামী দিনে তামিলনাড়ু ও কেন্দ্রের সম্পর্কেও নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।


