আমরা আজ যখন চাঁদের বুকে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখি, মঙ্গল অভিযানে রকেটে কোটি কোটি টাকা ঢালি, ঠিক তখনই বাংলারই এক প্রান্তে জীবন বাঁচাতে ভরসা হয়ে উঠছে বাঁশের ডুলি। পশ্চিম মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গ্রামবাসীদের এক কিলোমিটার দীর্ঘ বেহাল কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয়, কাঁধে বাঁশের পাটাতন নিয়ে। সভ্যতার এই বৈপরীত্যই যেন আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় শহরের আলো আর গ্রামের আঁধারের মধ্যে কতটা বিস্তৃত ফারাক।
দাসপুরের নিচ নারাজোল গ্রাম পঞ্চায়েতের সীমান্তবর্তী এক গ্রামে সম্প্রতি এমনই একটি দৃশ্য ধরা পড়ে। সেখানে রীতিমতো বাঁশ দিয়ে তৈরি ডুলিতে তুলে রোগীকে গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায় পৌঁছে দিতে হয়। তেঁতুলতলার বালিপোতা পর্যন্ত যাওয়ার একমাত্র রাস্তা এতটাই কর্দমাক্ত ও ভাঙাচোরা যে সামান্য বৃষ্টিতেই বাইক তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটে চলাও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের অন্তত তিন মাস এই গ্রামে যোগাযোগের একমাত্র উপায় হয় নৌকা। বাকি সময় কাদা-পানিতে পা ডুবিয়ে ক্ষেতের আইল ধরে, অথবা হাঁটু সমান জল মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। অ্যাম্বুল্যান্স, গাড়ি এসব শব্দ এখানে কেবল কাগজের কথাই। বাস্তব বলছে, এখানকার সবচেয়ে দ্রুত ‘পরিবহণ’ ব্যবস্থা হল এক জোড়া কাঁধ আর সেই পুরোনো বাঁশের তৈরি ডুলি।

সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হল—এই রাস্তা তৈরি করার জন্য টাকা বরাদ্দ হলেও, জমি জটের কারণে কাজ শুরুই হয়নি। বরাদ্দের অর্থ ফিরে গিয়েছে। অর্থাৎ, উন্নয়নের কাগজে যেটা সম্পূর্ণ, বাস্তবে সেটা শুরুই হয়নি।
এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে নারায়ণগড়েও দেখা গেছে, রাস্তায় কাদা আটকে প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন এক গর্ভবতী নারী। প্রশাসনের চোখ তখনও খুলেনি, এখনো অপেক্ষা করছে আরও কতটা ‘ভোগান্তি’ হলে কাগজের সিদ্ধান্ত জমির বাস্তবে রূপ নেবে।

এই ছবিগুলো কেবল করুণ বাস্তব নয়, এ আমাদের উন্নয়নের এক নির্মম ব্যর্থ দলিল। যেখানে একদিকে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র প্রচারে কোটি কোটি ব্যয় হয়, সেখানে অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য বাঁশে ঝুলে মানুষের জীবন নিয়ে ছুটতে হয় মাঠঘাট পেরিয়ে।
প্রশ্ন হল—এই দূরত্ব কতদিন চলবে? উন্নয়নের আলো কি কেবল শহরের প্রাসাদ ছুঁয়েই থেমে যাবে, নাকি গ্রামবাংলার এই কাদামাখা পথেও একদিন পৌঁছবে সুস্থতার সুবাতাস?


