Saturday, September 5, 2026
28 C
Kolkata

রাজনীতির রক্তাক্ত ছায়ায় নিভে গেল এক ছোট্ট প্রাণ, কালীগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণে মৃত চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী

ভোটের ফলাফল তখনও ঘোষণা হয়নি। কিন্তু তৃণমূল সমর্থকদের বিজয় উদ্‌যাপন তখনই শুরু হয়ে গিয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। সেই উৎসবের মাঝেই হঠাৎ আকাশ ফাটানো আওয়াজ। চারপাশ থমকে গেল। আর সেখানেই থেমে গেল এক ছোট্ট মেয়ের জীবন। নাম না জানা হাজারো ভবিষ্যতের সঙ্গে হারিয়ে গেল মাত্র নয় বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশু।

মোলান্ডি গ্রাম আজ শোকস্তব্ধ। যে হাসিমুখে ছোট্ট মেয়েটি সকালবেলা স্কুলব্যাগ নিয়ে বের হত, সেই মুখ আজ নিথর। কাঁধে বই নয়, আজ তাকে বহন করছে শববাহী গাড়ি।

মেয়েটির মা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কাঁপা গলায় বললেন,
“স্নান সেরে ফিরছিলাম ছেলে-মেয়েকে নিয়ে। হঠাৎ বিকট আওয়াজ। ভাবলাম বাজি ফাটছে, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝতে পারি কিছু ভয়ানক ঘটেছে। মেয়েটা আমার হাত শক্ত করে ধরে ছিল… তারপর একটা বিস্ফোরণ… আর আমি শুধু দেখলাম মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে আমার সোনাটা।”

মায়ের চোখে তখন শুধুই ভয়, হতাশা আর সীমাহীন শোক। বারবার বলছেন, “ওরা জানত আমার মেয়ে আছে। আমি রাজনীতি করি না, তাও ওরা বুঝে শুনেই এটা করল। কেন? আমি কী করেছিলাম?”

স্থানীয়রা জানান, ওই সময় এলাকায় ছিল তৃণমূল সমর্থকদের একটি মিছিল। বিজয়ের উল্লাসে নাকি বোমা ছোঁড়া হচ্ছিল, আর সেখান থেকেই ঘটে এই দুর্ঘটনা। কেউ কেউ দাবি করছেন, সিপিএম সমর্থকদের বাড়ি লক্ষ্য করে ইচ্ছাকৃতভাবে ছোঁড়া হয়েছিল সেই বোমা।

এক প্রতিবেশী জানান,
“ওরা এসে বলছিল, আগে ওকে শেষ কর। এরপরই একের পর এক বোমা পড়ে। ওই বাচ্চাটাকে তো আমরা সবাই চিনি। ওর কী দোষ ছিল? একটা মেয়ের প্রাণ চলে গেল, এটা কি কোনো রাজনৈতিক খেলায় মানায়?”

পুলিশ ইতিমধ্যেই একজনকে গ্রেফতার করেছে বলে খবর, তবে আরও যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাদের খোঁজ চলছে। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত চলছে, এবং ঘটনাটি দুর্ঘটনা বলেই প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত মতামত ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পরই দেওয়া যাবে।

এদিকে, নির্বাচন কমিশনও জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে রিপোর্ট তলব করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—

“একটি শিশু রাজনীতি বোঝে না, দলের প্রতীক চেনে না, শত্রু-মিত্র আলাদা করতে শেখেনি। তাহলে কেন তার জীবন এমন নিষ্ঠুরভাবে কেড়ে নেওয়া হল? আর সেই দলের উল্লাসেই যদি বোমা ব্যবহার হয়, তাহলে সেটা কীভাবে জয়?”

আজ ওই মেয়েটির ছোট্ট স্কুলে নেই তার কণ্ঠস্বর। পাড়া-প্রতিবেশীর উঠানে নেই তার ছুটে চলা পায়ের শব্দ। যে বাড়িতে তার হাসি ছিল আলোর মতো, আজ সেখানে শোকের কালো ছায়া।

শিশুটির বাবা কাজের সূত্রে বাইরে থাকেন। বারবার ফোন করছেন, মেয়ের কথা জানতে চাইছেন। আর মা? তিনি জানেন না কীভাবে বলবেন —
“ও তো আর নেই… আমার সোনাটা নেই ” …

এই মৃত্যু শুধুই একটি শিশু নয়, হারিয়ে যাওয়া একটি প্রজন্মের নির্দোষতা। এ ধরনের ঘটনায় রাজনীতি থেমে না থাকলেও, একটি পরিবারের জীবন চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। আজ কালীগঞ্জের সেই পরিবার শুধুই প্রশ্ন করতে চায়— এই মৃত্যু কার দায়?

Hot this week

ভূমধ্যসাগরে মাইক্রোঅ্যালগির দাপট! ইজরায়েলের অধিকাংশ ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট বন্ধ, জলসংকটের আশঙ্কা

ভূমধ্যসাগরে হঠাৎ করে বেড়ে ওঠা মাইক্রোঅ্যালগির কারণে বড়সড় সমস্যায়...

গাঁজা সেবনের অভিযোগে ফুকেত-দিল্লি ফ্লাইটের সেই পাইলটকে এবার বরখাস্ত করল এয়ার ইন্ডিয়া!

ফুকেত থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে বিপদের মুখে পড়া এয়ার...

Topics

‘আমরা কি কারও গোলাম?’ টাটাদের ব্যবসা গোটানোর নির্দেশ কেনিয়ার রাষ্ট্রপতির

কেনিয়ায় বড়সড় ধাক্কার মুখে টাটা গোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সামলানোর...

Related Articles

Popular Categories