চারদিকে ভাঙা দেয়াল, পোড়া কংক্রিট আর স্মৃতির মতো দাঁড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ—সেই জায়গাতেই আয়োজন করা হলো এক ব্যতিক্রমী সমাবর্তন। গাজার আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্স, যা একসময় ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ছিল, সেখানেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে সনদ গ্রহণ করলেন ১৬৮ জন ফিলিস্তিনি ডাক্তার। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার মাঝেও এই অনুষ্ঠান হয়ে উঠল অদম্য মানসিক শক্তি আর বেঁচে থাকার প্রত্যয়ের প্রতীক।
বৃহস্পতিবার গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালের ধ্বংসপ্রায় মূল ভবনের সামনে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। নিজেদের তাঁরা নাম দিয়েছেন ‘হিউম্যানিটি কোহর্ট’। টানা দুই বছর ধরে যুদ্ধ, অনাহার, বাস্তুচ্যুতি আর মৃত্যুর ছায়ার মধ্যে কাজ করেই তাঁরা সম্পন্ন করেছেন প্যালেস্টিনিয়ান বোর্ডের কঠিন পরীক্ষাগুলি।
এই চিকিৎসকদের অনেকেই একই সঙ্গে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার কেউ কেউ আহত হয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন বা পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন। তবু থেমে থাকেননি। ভাঙা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে সনদ গ্রহণ যেন সেই লড়াইয়েরই নীরব ঘোষণা।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ইউসুফ আবু আল-রিশ এই সমাবর্তনকে বর্ণনা করেছেন, “যন্ত্রণার গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া এক অর্জন”—বোমাবর্ষণের মধ্যেই, রক্ত আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে পাওয়া এক শিক্ষা।
আল-শিফা হাসপাতালের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ডা. মোহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, “এই যুদ্ধের লক্ষ্য শুধু ভবন ধ্বংস নয়, ফিলিস্তিনের মানবসম্পদ ধ্বংস করা। কিন্তু এই চিকিৎসকরাই প্রমাণ করেছেন—সেই চেষ্টা সফল হয়নি।”
সমাবর্তনে উপস্থিত ছিলেন ডা. আহমেদ বাসিল, যিনি বলেন, “সবচেয়ে কঠিন সময়ে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি ভবনের ভেতর ডিগ্রি অর্জন মানে একটাই বার্তা—আমরা জীবনকে ভালোবাসি, জ্ঞান আর বিজ্ঞানচর্চা থেকে সরে যাই না।”
অনুষ্ঠানে রাখা হয়েছিল কিছু খালি চেয়ার। প্রতিটি চেয়ারে টাঙানো ছবি—যুদ্ধের সময় নিহত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। নীরব সেই উপস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এই অর্জনের পেছনে কতজনের রক্ত আর ত্যাগ লুকিয়ে আছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে আল-শিফা হাসপাতাল একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। দু’বার সেনা অভিযান, দীর্ঘ অবরোধ আর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে হাসপাতালের বড় অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে বর্ণনা করেছিল, “মানুষের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ফাঁপা খোলস” হিসেবে।
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৮টি কোনওরকমে আংশিকভাবে চালু রয়েছে। হাজার হাজার গুরুতর অসুস্থ মানুষ, অসংখ্য শিশু আজও চিকিৎসার অপেক্ষায়।
এই বাস্তবতার মাঝেই আল-শিফার ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ১৬৮ জন চিকিৎসকের সনদ গ্রহণ যেন শুধু একটি সমাবর্তন নয়—এ এক নীরব প্রতিবাদ, এক মানবিক ঘোষণা। যুদ্ধ সবকিছু ভাঙতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, দায়িত্ববোধ আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারে না—গাজার এই ছবিই তার প্রমাণ।


