গাজা উপত্যকা ২০২৫ সালে কার্যত সাংবাদিকদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল হয়ে উঠেছে। একের পর এক হামলা, হত্যাকাণ্ড, স্থায়ী পঙ্গুত্ব—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের ওপর নেমে এসেছে এক ভয়াবহ দমন-পীড়নের অধ্যায়। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, এই সহিংসতা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক এক নীতির প্রতিফলন।
ইউনিয়নের স্বাধীনতা বিষয়ক কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর আচরণে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। আগে যেখানে সাংবাদিকদের কাজ বাধাগ্রস্ত করা হতো, সেখানে এখন সরাসরি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের সরিয়ে দেওয়া এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বিশ্বদরবারে পৌঁছাতে না দেওয়া।
২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত অন্তত ৭৬ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন। কমিটির মতে, এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি বিপজ্জনক প্রবণতার ইঙ্গিত। সাংবাদিকরা এখন আর ‘সম্ভাব্য লক্ষ্য’ নন, বরং নিয়মিত ও নিশ্চিত লক্ষ্যবস্তু।
গত এক বছরে গাজায় একাধিক সাংবাদিককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছে, নিহত সাংবাদিকরা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—যদিও স্বাধীন পর্যবেক্ষকেরা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও, এখনো পর্যন্ত কোনো ঘটনার জন্য ইসরায়েলি বাহিনীর কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।
এই সহিংসতার শিকড় যে নতুন নয়, তাও মনে করিয়ে দিয়েছে সাংবাদিক ইউনিয়ন। গত দুই দশকে পশ্চিম তীর ও গাজায় বহু আরব সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২০২২ সালে পশ্চিম তীরে নিহত আল জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কমিটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সাল ছিল এই সহিংসতার চূড়ান্ত পর্যায়। সাংবাদিকদের তাঁবু, হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি ব্যক্তিগত বাসভবনেও হামলা চালানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শরীরের সংবেদনশীল অংশ লক্ষ্য করে আঘাত করা হয়েছে, যার ফলে কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, কেউ পা হারিয়েছেন, আবার কেউ স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছেন।
হুমকির উৎসও ছিল বহুমুখী—ইসরায়েলি সেনাবাহিনী, সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী, ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণ। বছরের শুরুতে গাজায় সাংবাদিকদের বাড়িঘর বোমা হামলার লক্ষ্য হয়, আর পশ্চিম তীরে সরাসরি গুলিতে আহত হন সংবাদকর্মীরা। ধীরে ধীরে সাংবাদিকদের পরিচয়ই হয়ে ওঠে হামলার প্রধান কারণ।
এপ্রিল-মে মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। নাসের হাসপাতালের কাছে সাংবাদিকদের একটি তাঁবুতে হামলায় একসঙ্গে আহত হন একাধিক সংবাদকর্মী, যাদের কয়েকজন পরে মারা যান। ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত একটি সংবাদস্থলে হামলাকে ‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে কমিটি।
গাজা শহর, খান ইউনিস, রাফা, জাবালিয়া—এই সব এলাকা এখন সাংবাদিকদের জন্য রীতিমতো আতঙ্কের নাম। পশ্চিম তীরেও জেরুজালেম, জেনিন, হেবরনসহ একাধিক এলাকায় সাংবাদিকরা হামলার শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা প্রেস ভেস্ট পরে, পরিচয়পত্র দেখিয়েও রেহাই পাননি।
সম্প্রতি রামাল্লার কাছে দেইর দিবওয়ান গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা কভার করতে গিয়ে প্রহৃত হন সাংবাদিক মোহাম্মদ তুর্কমান। ক্যামেরা বন্ধ করতে বলা হয় তাঁকে, নির্দেশ মানার পরও তাঁকে আটক করে মারধর করা হয় এবং সরঞ্জাম ভেঙে ফেলা হয়। এই ঘটনাকে সাংবাদিক ইউনিয়ন বৃহত্তর দমননীতির অংশ হিসেবেই দেখছে।
স্বাধীনতা বিষয়ক কমিটির প্রধান মুহাম্মদ আল-লাহহামের মতে, ২০২৫ সালে যা ঘটেছে তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। তাঁর ভাষায়, “এটা কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; এটি এমন এক নীতির ফল, যেখানে সাক্ষী, বর্ণনা ও ছবি—সবকিছু মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।”
কমিটির সতর্কবার্তা স্পষ্ট—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তাই এই সহিংসতাকে আরও উৎসাহ দিচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে শুধু সংবাদই নয়, সত্যও ক্রমে অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।


