গাজা অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের একাধিক সদস্যের উপর ইজরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। ইজরায়েলি পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ আটক করা সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের উপর যৌন হেনস্তা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ করেছে বলে দাবি করেছে এই আন্তর্জাতিক সংগঠন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক তদন্তের জোরালো দাবি তোলা হয়েছে।
রবিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন জানায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ফ্লোটিলার জাহাজ আটক করার পর শতাধিক সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক ও কর্মীকে হেফাজতে নেওয়া হয়। আটক অবস্থাতেই এই নির্যাতনের ঘটনাগুলি ঘটে বলে অভিযোগ। যদিও এই নির্দিষ্ট অভিযোগগুলি নিয়ে এখনও পর্যন্ত ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
এই অভিযোগ নতুন মাত্রা পায়, যখন জার্মান সাংবাদিক আনা লিডটকে ২১ ডিসেম্বর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রকাশ্যে জানান, ইজরায়েলি হেফাজতে থাকার সময় তাঁকে ধর্ষণ করা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক দেহতল্লাশির বিরোধিতা করায় এই নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাঁকে। কোয়ালিশন জানিয়েছে, ঘটনার প্রকাশের পর থেকেই তারা আনা লিডটকেকে মানসিক ও আইনি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
সংগঠনের দাবি, আনা লিডটকের পাশাপাশি ইতালীয় সাংবাদিক ভিনচেনজো ফুলোনে এবং অস্ট্রেলিয়ান মানবাধিকার কর্মী সূর্য ম্যাকইউয়েনও আটক অবস্থায় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। আরও বেশ কিছু নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কোয়ালিশন, যদিও নির্যাতিতদের ইচ্ছা ও নিরাপত্তার বিষয়টি তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখবে বলে জানানো হয়েছে।
ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের মতে, এই ঘটনাগুলি মানব মর্যাদার চরম লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের গুরুতর অবমাননা। সংগঠনটির বক্তব্য, “এই ধরনের অপরাধের জন্য অবিলম্বে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন জবাবদিহি প্রয়োজন।”
সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, ইজরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বন্দিদের উপর নির্যাতনের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যার শিকার মূলত ফিলিস্তিনিরা। বিভিন্ন ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টের উল্লেখ করে তারা জানায়, আটক কেন্দ্রে যৌন নির্যাতন, অপমানজনক তল্লাশি ও শারীরিক অত্যাচারের একাধিক নজির রয়েছে।
ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের সাম্প্রতিক রিপোর্টে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনি বন্দিদের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। এর আগেও রাষ্ট্রপুঞ্জ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থা ইজরায়েলি আটক কেন্দ্রে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, যার কিছু ঘটনাকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
যদিও ইজরায়েল সরকার বরাবরই এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, সমস্ত নিরাপত্তা বাহিনী আইনের শাসনের মধ্যেই কাজ করে এবং কোনও অভিযোগ উঠলে তদন্ত হয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, এই তদন্তগুলি কার্যত নিষ্ফল।
ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ তৈরি করার অভিযোগ তুলে জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার উপর ভরসা করা যায় না। তাই তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের বিভিন্ন মঞ্চে বিষয়টি তুলতে প্রস্তুত।
বিবৃতিতে রাষ্ট্রপুঞ্জ ও তার সদস্য দেশগুলির কাছে ইজরায়েলি আটক কেন্দ্রে প্রবেশাধিকার চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যৌন নির্যাতন ও অত্যাচারের অভিযোগে আইসিসির তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনের স্পষ্ট বক্তব্য, “এই অপরাধগুলিকে দখলদারি ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার অস্বীকারের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।”


