Friday, March 6, 2026
32.6 C
Kolkata

ইন্দো-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে কি অন্ধকার নেমে আসছে দরিদ্র ভারতীয় কৃষকদের জীবনে?

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে নতুন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা এসেছে, তা ঘিরে দেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছিল যে কেন্দ্র সরকার কৃষিক্ষেত্রকে আন্তর্জাতিক চুক্তির বাইরে রাখবে। এমনকি শাসকদলের ঘনিষ্ঠ কিছু সংবাদমাধ্যমও বারবার জানিয়েছিল, বিদেশি চাপের সামনে নতি স্বীকার করা হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি ভিন্ন পথে গড়িয়েছে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছিলেন, দেশের কৃষক, পশুপালক ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থ রক্ষা করা সরকারের প্রথম দায়িত্ব। তিনি জোর দিয়ে জানিয়েছিলেন, তাদের ক্ষতি হতে পারে, এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির সময়ও কৃষিকে বাদ রাখার বিষয়টি বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। সরকারপক্ষ বলেছিল, এভাবেই কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই ঘোষণা করেছেন যে নতুন চুক্তির আওতায় কৃষিপণ্যও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও প্রকাশ পায়নি। কিন্তু ওয়াশিংটনের তরফে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, মার্কিন কৃষিজ পণ্যের জন্য ভারতের বাজার উন্মুক্ত করা হচ্ছে। মার্কিন কৃষিমন্ত্রীও এই সিদ্ধান্তকে তাদের চাষিদের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নীতি ছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে কৃষিক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত না করা। যুক্তি ছিল, ভারতের কৃষকরা এমনিতেই নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন, তাদের আরও প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবে না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, উন্নত দেশগুলিতে কৃষকদের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হয়। ফলে তারা কম দামে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করতে সক্ষম হন। এর ফলে ভর্তুকিহীন বা কম সহায়তা পাওয়া দেশের কৃষকরা সমস্যায় পড়েন। ভারতের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, কৃষকদের উপর নানা আর্থিক চাপ রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সরকার কৃষকদের যতটা সাহায্য দেয়, তার চেয়ে বেশি বিভিন্ন উপায়ে আদায় করে নেয়। তাই বিদেশি সস্তা পণ্য ঢুকলে দেশীয় উৎপাদকরা দামের দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে পারেন। এই কারণেই এতদিন আমদানি শুল্ক আরোপ করে বাজারকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভুট্টা, সয়াবিন ও তুলা উৎপাদক দেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেখানে উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা নতুন বাজার খুঁজছে। ভারত বিশাল ভোক্তা দেশ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তাদের নজর এদিকে। এতদিন উচ্চ আমদানি শুল্ক ও কিছু বিশেষ বিধিনিষেধের কারণে মার্কিন পণ্য সহজে ঢুকতে পারেনি। বিশেষ করে জেনেটিকালি পরিবর্তিত (জিএম) ভুট্টা ও সয়াবিন ভারতে অনুমোদিত নয়। পাশাপাশি দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত ছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, নতুন চুক্তিতে এই শর্তগুলির কতটা পরিবর্তন হবে। বিস্তারিত শর্ত প্রকাশ না হওয়ায় স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে যদি শুল্ক কমে যায় বা বিধিনিষেধ শিথিল হয়, তাহলে আমেরিকার সস্তা ভুট্টা, সয়াবিন কিংবা অন্যান্য পণ্য ভারতীয় বাজারে ঢুকতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশীয় চাষিদের উপর।ভুট্টা ও সয়াবিন চাষ গত কয়েক বছরে ভারতে বেড়েছে। অনেক কৃষক এই ফসল থেকে ভালো দামও পেয়েছেন। কিন্তু আমদানি বাড়লে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাবে, ফলে দাম কমার আশঙ্কা রয়েছে। তুলার ক্ষেত্রে প্রভাব কিছুটা আলাদা হতে পারে, কারণ দেশে উৎপাদন কমেছে এবং আমদানি আগেই ছিল। তবু সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির উপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

আখচাষিরাও উদ্বেগে রয়েছেন। যদি বিদেশ থেকে ইথানল আমদানি শুরু হয়, তাহলে দেশীয় চিনিকলগুলির উৎপাদন ও কেনাবেচায় প্রভাব পড়তে পারে। এতে আখচাষিরা আর্থিক চাপে পড়বেন। একইভাবে, দুগ্ধখাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদি আমদানি শুল্ক কমে এবং শর্ত শিথিল হয়, তাহলে বিদেশি দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, কৃষক ও দুগ্ধখাতের স্বার্থ রক্ষা করা হবে। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, আলোচনাও এখনও চলছে। এতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। চুক্তি চূড়ান্ত না হলে সুরক্ষার আশ্বাস কীভাবে দেওয়া হচ্ছে? আবার যদি সব ঠিকঠাক থাকে, তাহলে শর্ত প্রকাশে বাধা কোথায়, সেটিও জানতে চাইছেন অনেকে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্রীয় বাজেটের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কৃষিখাতে বরাদ্দের হার ধীরে ধীরে কমেছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কিছু ঘোষিত প্রকল্পের জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দও করা হয়নি। ভর্তুকি কমানোর কথাও শোনা যাচ্ছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, কৃষিক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।

সব মিলিয়ে নতুন বাণিজ্য চুক্তি দেশের কৃষকদের জন্য কতটা সুফল বা কুফল বয়ে আনবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে উদ্বেগ যে তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। সরকার কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ সামলাবে এবং কৃষকদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত করবে, এখন নজর সেদিকেই। একই সঙ্গে কৃষক সংগঠনগুলিও পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে।

Hot this week

শান্তিপুরে বিজেপি পার্টি অফিসে এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ , জেলা সহ-সভাপতির নাম জড়িত!

নদিয়ার শান্তিপুরে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ, এক...

Topics

শান্তিপুরে বিজেপি পার্টি অফিসে এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ , জেলা সহ-সভাপতির নাম জড়িত!

নদিয়ার শান্তিপুরে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ, এক...

ইরানের নেতৃত্বে কি বসতে চলেছেন খামেনেই-র পুত্র?

ইরানের রাজনীতিতে শিগগিরই বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দেশের...

পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালী ঘিরে কড়া অবস্থান নিলো ইরান

পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে ইরান নিজেদের নিরাপত্তা...

তামিলনাড়ুতে জাতিগত হামলা: প্রতিবন্ধী দলিত ও ওড়িশার শ্রমিক নিহত, অভিযুক্তদের আগে রয়েছে সহিংসতার ইতিহাস

তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার নাঙ্গুনেরি এলাকার পেরুমপাথ্তু গ্রামে ভয়াবহ হামলার...

Related Articles

Popular Categories