Saturday, November 7, 2026
27 C
Kolkata

ঝাড়খণ্ডের সরকারি পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগে ফের অনশন! মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রমাণসহ অভিযোগ জমা দিলেও মিলল না সুরাহা

ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। রাজ্যের রাজধানী রাঁচিতে গত কয়েকদিন ধরে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর অসংগতি ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর সেই আবহেই ঝাড়খণ্ডে আন্দোলনের সূচনা হয়। গত ২৫ জুলাই থেকে রাঁচিতে প্রতিবাদ শুরু করেন চাকরিপ্রার্থীরা। প্রথমে অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী এই কর্মসূচিতে অংশ নিলেও ধীরে ধীরে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে বহু শিক্ষার্থী অবস্থান বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। গত ২৯ জুলাই থেকে সেখানে লাগাতার ধর্না চলছে।

আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতোর অনশন কর্মসূচিকে ঘিরে। রবিবার থেকে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে চাকরিপ্রার্থীরা ন্যায্য বিচার এবং সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়ে এলেও এখনও পর্যন্ত সেই দাবির যথাযথ সাড়া মেলেনি। তাই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে এবং শিক্ষার্থীদের মনোবল ধরে রাখতে তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো বলেন, নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্র এবং রাজ্য—দুই সরকারের মনোভাব শিক্ষার্থীদের হতাশ করছে। তাঁর দাবি, যারা বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও রকম অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি, চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ১৪তম সম্মিলিত প্রাথমিক পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, ওই পরীক্ষায় নানা ধরনের অনিয়ম হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত মেধাবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের সিজিএল-সহ অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাতেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, শুধুমাত্র প্রশাসনিক তদন্তে তাঁদের আস্থা নেই। তাই পুরো বিষয়টি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এবং আর্থিক অপরাধের তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হোক। তাঁদের বিশ্বাস, স্বাধীন তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো জানান, এই আন্দোলন একদিনে শুরু হয়নি। প্রাথমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে অভিযোগ জানানো হয়, প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয় এবং পরে মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও প্রমাণ-সহ অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও সন্তোষজনক পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলেই তাঁদের দাবি।

শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছেন। প্রথমত, বিতর্কিত প্রাথমিক পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমস্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতের সব নিয়োগ পরীক্ষায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নির্ভুল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

রবিবার আন্দোলনকারীরা রাঁচির আলবার্ট এক্কা চক পর্যন্ত মিছিল করেন। সেখানে তাঁরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে দ্রুত তদন্তের দাবি তোলেন। একই সঙ্গে ছাত্র ঐক্যের বার্তা তুলে ধরেন এবং রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বিক্ষোভ ঘিরে এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।

এদিকে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কোনও দোষীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তে যদি অনিয়মের প্রমাণ মেলে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। যদিও এই আশ্বাসে এখনও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে প্রকাশ্যে ঝাড়খণ্ডের শিক্ষার্থীদের সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের দাবি ন্যায্য এবং তাঁদের সংগ্রামের প্রতি তাঁর সংগঠনের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুরুতে রাঁচির একটি ছোট জায়গায় সীমিত সংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর প্রতিবাদ হিসেবে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যজুড়ে বড় আকার ধারণ করেছে। এখন শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, সমাজকর্মী এবং সাধারণ মানুষের একাংশও এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। ফলে ঝাড়খণ্ডে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির দাবি এখন একটি বড় জনআন্দোলনের রূপ নিয়েছে।

Hot this week

মুম্বইয়ের জনসংখ্যার চরিত্র বদলাচ্ছে, মুসলিমদের জন্মহার বাড়ছে’, বিতর্কিত দাবি বিজেপি নেতা কিরীট সোমাইয়ারের

মুম্বইয়ের জনসংখ্যার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মহার...

বাদ পড়া ভোটারদের নাম তালিকাভূক্ত করতে অবশেষে ৭ রাজ্যে বিজ্ঞপ্তি জারি ইলেকশন কমিশনের

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া...

E20 পেট্রলে ৩১% এর বেশি ইথানল, কেন্দ্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি কর্ণাটক সরকারের

পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে...

Topics

মুম্বইয়ের জনসংখ্যার চরিত্র বদলাচ্ছে, মুসলিমদের জন্মহার বাড়ছে’, বিতর্কিত দাবি বিজেপি নেতা কিরীট সোমাইয়ারের

মুম্বইয়ের জনসংখ্যার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মহার...

বাদ পড়া ভোটারদের নাম তালিকাভূক্ত করতে অবশেষে ৭ রাজ্যে বিজ্ঞপ্তি জারি ইলেকশন কমিশনের

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া...

E20 পেট্রলে ৩১% এর বেশি ইথানল, কেন্দ্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি কর্ণাটক সরকারের

পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে...

Related Articles

Popular Categories