হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নেপাল। আয়তনে ছোট হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই খবরের শিরোনামে উঠে আসে দেশটি। কখনও ভূমিকম্প, কখনও ভূমিধস, আবার কখনও হড়পা বান—বছরের বিভিন্ন সময়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে হিমালয়ের এই দেশ। সম্প্রতি ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ হড়পা বান সেই আশঙ্কাই আরও এক বার সামনে এনেছে।
নেপালের বিপদের অন্যতম কারণ তার ভৌগোলিক অবস্থান। ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশীয় প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে দেশটি। এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চাপ তৈরি হচ্ছে। ভারতীয় প্লেট প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার করে ইউরেশীয় প্লেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর ফলেই হিমালয় অঞ্চলে ভূগর্ভে ক্রমাগত শক্তি জমা হচ্ছে। সেই শক্তি হঠাৎ বেরিয়ে এলে ভূমিকম্পের মতো বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। হিমালয় এখনও ভূতাত্ত্বিক ভাবে তরুণ পর্বতমালা। ফলে এর গঠন প্রক্রিয়া পুরোপুরি থেমে যায়নি। দুই প্লেটের সংঘর্ষের কারণে পর্বতশ্রেণির উচ্চতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের উচ্চতা প্রতি বছর কয়েক মিলিমিটার করে বাড়ার অন্যতম কারণও এই ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়ের বিপদ আরও বাড়িয়ে তুলছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গত কয়েক দশকে হিমবাহ গলার গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ২০০০ সালের পর বরফ গলার হার আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের জল জমে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। কোনও হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল জল, বরফ, কাদা ও পাথর নীচের দিকে ধেয়ে এসে ভয়াবহ হড়পা বান তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হিমালয়ে নির্বিচারে গাছ কাটা, পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, সুড়ঙ্গ খোঁড়া এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। গত কয়েক বছরে উত্তরাখণ্ড, সিকিম, জম্মু-কাশ্মীর-সহ হিমালয় সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হড়পা বান ও ভূমিধস সেই আশঙ্কারই প্রমাণ দিয়েছে।
ভোটেকোশীর সাম্প্রতিক বিপর্যয় নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ঔ ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে-এর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি ভূমিকম্পের কারণে নয়, বরং হিমবাহধসের ফলেই ঘটেছে। পাহাড় থেকে বরফ, কাদা ও পাথরের বিশাল স্তূপ নদীতে নেমে আসায় আচমকা জলের স্রোত ভয়ঙ্কর আকার নেয়।
এই বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা ১৫৭-তে পৌঁছেছে বলে খবর। নিখোঁজ বহু মানুষ। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটকও রয়েছেন। কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার পথে থাকা বহু পর্যটকের সন্ধান এখনও মেলেনি। ফলে নেপালের পাশাপাশি ভারত ও চিনের জন্যও হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।


