দু’জনের নামই অসীম। দু’জনেই বিজেপির বিধায়ক। দু’জনেরই দাবি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল। অথচ জমি নিয়ে দুই ‘অসীম’-এর বিবাদ ঘিরে এখন সরগরম নদিয়ার রাজনৈতিক মহল। দু’পক্ষের বক্তব্যেই স্পষ্ট—বিতর্কিত জমির এক ইঞ্চিও ছাড়তে নারাজ কেউই।
নদিয়ার চাকদহ থানার শিমুরালির নরপতিপাড়া মৌজায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক সংলগ্ন ৩২ শতক জমির মধ্যে ১১ শতক সম্পত্তি নিয়েই এই বিবাদ। ওই জমির দাবিদার রানাঘাট দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক অসীমকুমার বিশ্বাস এবং হরিণঘাটার বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকার।
ঘটনার সূত্রপাত আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণে। কলকাতা বিমানবন্দরের চাপ কমাতে বিকল্প হিসেবে কল্যাণীতে বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। প্রস্তাবিত গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরের কাছেই রয়েছে এই বিতর্কিত জমি। ফলে জমির গুরুত্বের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এর বাজারদর নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে।
রানাঘাট দক্ষিণের বিধায়ক অসীমকুমার বিশ্বাসের দাবি, ২০২১ সালেই তিনি জমির রেকর্ড এবং চেন ডিড খতিয়ে দেখে ওই সম্পত্তি কিনেছিলেন। তাঁর কাছে জমি সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি রয়েছে বলেও দাবি তাঁর।
অসীমকুমার বিশ্বাসের কথায়, “আমার নথি জাল না ওঁর নথি জাল, সেটা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে।” অন্যদিকে, জমিটির মালিকানা নিয়ে নিজের দাবির পক্ষে দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরেছেন হরিণঘাটার বিধায়ক অসীম সরকার। তাঁর দাবি, ১৯৮৯ সালে যমুনা রানি দত্ত, আবুল হোসেন তরফদারের কাছে জমিটি বিক্রি করেন। আবুল হোসেন সেখানে চাষ করতেন এবং জমির একটি অংশ বর্গা হিসেবেও রেকর্ড ছিল।
অসীম সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে আবুল হোসেন তরফদার অশোক বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তিকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই আবুল হোসেনের মৃত্যু হওয়ায় সেই পাওয়ারনামা বাতিল হয়ে যায়। এরপর আবুল হোসেনের সন্তানরা জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে দাবি হরিণঘাটার বিধায়কের।
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি বিএলআরও-র কাছেও যান এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখার পর গত ২৫ অগস্ট কল্যাণীতে রেজিস্ট্রি করে মোট ৩২ শতক জমি কেনেন।
তবে জমি রেজিস্ট্রির দিনই বিতর্ক প্রকাশ্যে আসে। অসীম সরকারের অভিযোগ, রানাঘাট দক্ষিণের বিধায়কের অনুগত কয়েক জন রেজিস্ট্রির কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
হরিণঘাটার বিধায়কের দাবি, “আমি যতক্ষণ ওই ১১ শতক জমি লিখে না দিচ্ছি, ততক্ষণ উনি (অসীমকুমার বিশ্বাস) ওই জমির মালিক হতে পারবেন না।”
পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন রানাঘাট দক্ষিণের বিধায়কও। তাঁর বক্তব্য, ২০২১ সালেই তিনি যখন ওই জমি কিনেছিলেন, তখন বিষয়টি জানা সত্ত্বেও কেন অসীম সরকার সেখানে গিয়ে জমি কিনলেন?
বর্তমানে বিতর্কিত জমির উপর দুই বিধায়কের নামেই আলাদা দু’টি বোর্ড ঝুলছে। ফলে জমির মালিকানা নিয়ে বিবাদ এখন কার্যত প্রকাশ্য। তার উপর প্রস্তাবিত কল্যাণী বিমানবন্দর ঘিরে এলাকায় জমির দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দুই বিজেপি বিধায়কের এই জমি-লড়াই আরও বেশি তাৎপর্য পাচ্ছে।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল থাকার দাবি করলেও একই জমির মালিকানা নিয়ে দুই বিধায়কের পরস্পরবিরোধী দাবি এখন নদিয়ার রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চার বিষয়। শেষ পর্যন্ত নথি এবং আইনি প্রক্রিয়ায় কার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেদিকেই নজর সকলের।


