মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাড়তে থাকা ক্ষোভ—এই তিনের প্রভাব কি পড়ছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থায়? এমনই প্রশ্ন তুলে দিল C-Voter-এর সাম্প্রতিক ‘মুড অব দ্য নেশন’ (MOTN) সমীক্ষা। আগস্ট মাসে করা এই সমীক্ষায় দেশজুড়ে ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৪৪ জন নাগরিকের মতামত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, ৪৭ শতাংশ মানুষ মনে করছেন, মোদি জমানায় ‘গণতন্ত্র বিপদের মুখে’। অন্যদিকে ৪২ শতাংশের মত, গণতন্ত্র কোনও বিপদের মধ্যে নেই। বাকিরা এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। উল্লেখযোগ্য ভাবে, জানুয়ারি মাসের সমীক্ষায় এই ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।
শুধু গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ নয়, সমীক্ষায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও পতনের ইঙ্গিত মিলেছে। জানুয়ারিতে যেখানে ৫৫ শতাংশ মানুষ মোদিকে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন করেছিলেন, এবার সেই হার কমে ৪৮.৭ শতাংশে নেমেছে বলে সমীক্ষায় দাবি।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া মানুষের কাছে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল। সেখানে বেকারত্বই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও মানুষের অসন্তোষ স্পষ্ট। ২৩ শতাংশ মতামতদাতা মুদ্রাস্ফীতিকে মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলে মনে করেছেন।
অন্যদিকে, ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করছেন, কেন্দ্রের আর্থিক নীতির সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে অর্থনৈতিক নীতি নিয়েও সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের একাংশের অসন্তোষ বাড়ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সমীক্ষা।
‘এখনই লোকসভা নির্বাচন হলে’ কী ফল হতে পারে, সেই হিসাবও দেওয়া হয়েছে সমীক্ষায়। সেখানে দাবি করা হয়েছে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২ আসনের তুলনায় ১১টি আসন কম পেতে পারে বিজেপি। অর্থাৎ, বিজেপির সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ২৬১-এর আশপাশে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
অথচ জানুয়ারির সমীক্ষায় বিজেপির জন্য ২৮৭টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, কয়েক মাসের ব্যবধানে বিজেপির সম্ভাব্য আসনসংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পতনের ইঙ্গিত মিলেছে।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বাড়তে পারে বলেও সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে। জানুয়ারির তুলনায় কংগ্রেসের ঝুলিতে ২৬টি অতিরিক্ত আসন যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তবে বিজেপির জন্য পুরো ছবিটা অস্বস্তিকর হলেও এনডিএ-র ক্ষেত্রে এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোনও বড় সংকট দেখা যাচ্ছে না। সমীক্ষার হিসাব অনুযায়ী, এখন ভোট হলে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ পেতে পারে ৩২৬টি আসন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এনডিএ পেয়েছিল ২৯৩টি আসন। অর্থাৎ, শরিকদের সঙ্গে নিয়ে এনডিএ-র আসন বাড়ার সম্ভাবনার কথাই উঠে এসেছে এই সমীক্ষায়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির কাজের মূল্যায়নেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে C-Voter-এর সমীক্ষা। জানুয়ারিতে ৩৫.৬ শতাংশ মানুষ তাঁর কাজকে ‘অসাধারণ’ বলে মনে করেছিলেন। আগস্টের সমীক্ষায় সেই হার কমে ৩০.১ শতাংশ হয়েছে বলে দাবি।
অর্থাৎ, মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যেমন কমেছে, তেমনই তাঁর সরকারের কাজের প্রতি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট মানুষের সংখ্যাতেও পতনের ইঙ্গিত মিলেছে।
রামমন্দিরের প্রণামির টাকা চুরির ঘটনাও বিজেপির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে সমীক্ষায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ৪৬.৬ শতাংশ মতামতদাতা জানিয়েছেন, এই ঘটনা তাঁদের কাছে নরেন্দ্র মোদি এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়াও ৪৩.২ শতাংশ মানুষ মনে করছেন, এনডিএ সরকারের আমলে দুর্নীতি বেড়েছে। ফলে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর জনপ্রিয়তা জানুয়ারির তুলনায় খুব একটা বদলায়নি। সমীক্ষা অনুযায়ী, তাঁর জনপ্রিয়তা ২৭ শতাংশের কাছাকাছিই রয়েছে। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে বলেও সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মোদি ও রাহুলের পর জনপ্রিয়তার তালিকায় বড় চমক তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তথা টিভিকে নেতা বিজয়ের। ৯.২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তিনি তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন বলে দাবি সমীক্ষার। পিছনে পড়েছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অখিলেশ যাদবের মতো অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতারা।
সব মিলিয়ে, C-Voter-এর এই সমীক্ষা যদি রাজনৈতিক জনমতের বর্তমান চিত্রের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়, তাহলে বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তায় পতন। যদিও এনডিএ এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জায়গায় রয়েছে বলেই সমীক্ষার পূর্বাভাস, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ আগামী দিনে বিজেপির রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই নজর থাকবে।

