Saturday, October 24, 2026
26 C
Kolkata

বাংলার পর্যটনের প্রচারে আইফেল টাওয়ার-পিরামিড! বিজ্ঞাপন ঘিরে তুমুল বিতর্ক, প্রশ্ন ‘বাংলা কোথায়?’

বাংলাকে বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছিল বাংলার নতুন পর্যটন বিজ্ঞাপন। কিন্তু সেই বিজ্ঞাপন প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কারণ, বাংলার পর্যটনস্থল দেখানোর বদলে বিজ্ঞাপনে চোখে পড়ছে আইফেল টাওয়ার, রাশিয়ার সেন্ট বাসিলস ক্যাথেড্রাল, মিশরের পিরামিড এবং রিও ডি জেনেইরোর ‘ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার’-এর মতো আন্তর্জাতিক পর্যটনস্থল। অথচ বাংলার নিজস্ব পর্যটন আকর্ষণগুলির উপস্থিতি কার্যত নেই বললেই চলে।

বিজ্ঞাপনের শুরুতে কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী হাওড়া ব্রিজ। তবে সেটিও এত অল্প সময়ের জন্য যে পলক ফেললেই তা চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। এরপরই বিজ্ঞাপনের দৃশ্যপট চলে যায় বাংলার বাইরে। মরুভূমি, পিরামিড, আন্তর্জাতিক স্মৃতিসৌধ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিখ্যাত স্থাপত্য জায়গা করে নিয়েছে ভিডিওটিতে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—বাংলার পর্যটনের বিজ্ঞাপনে বাংলা কোথায়?

বাংলার ভৌগোলিক ও পর্যটন বৈচিত্র্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ। দক্ষিণে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য থেকে উত্তরে দার্জিলিংয়ের পাহাড় ও হিমালয়ের পাদদেশ—রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে একাধিক পর্যটনকেন্দ্র। দিঘা, মন্দারমণি, সুন্দরবন, দার্জিলিং, কালিম্পংয়ের পাশাপাশি রয়েছে কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির মন্দির, দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনের মতো ঐতিহ্যবাহী আকর্ষণ। অথচ নতুন বিজ্ঞাপনে সেগুলির অধিকাংশেরই দেখা মেলেনি।

শুক্রবার ধন্যধান্য প্রেক্ষাগৃহে আড়ম্বরের সঙ্গে প্রকাশ করা হয় নতুন স্লোগান—‘West Bengal: Where India Feels Different’। সেই সঙ্গে উন্মোচন করা হয় নতুন লোগোও। অভিযোগ উঠেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে তৈরি ‘বিশ্ব বাংলা’ ব্র্যান্ডিং সরিয়ে নতুন পরিচিতি প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এই পর্যটন প্রচারও তারই অংশ।

তবে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার বিজ্ঞাপনে কেন মস্কো, মিশর, প্যারিস কিংবা রিও ডি জেনেইরোর দৃশ্য ব্যবহার করা হবে? বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটনস্থল দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এই বিতর্কে রাজনৈতিক মহল থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এক্স হ্যান্ডেলে বিজ্ঞাপনটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর মন্তব্য, এটি বিজ্ঞাপনের নামে কার্যত ‘আবর্জনা’।

অন্যদিকে বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথাগত রায়ও বিজ্ঞাপনটির সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, এটি একটি ‘বোকাবোকা’ এবং ‘অপেশাদার’ ভিডিও। পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপনে মস্কো, মিশর কিংবা রিও ডি জেনেইরোর দৃশ্য কেন থাকবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন তথাগত।

তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের প্রচার আসলে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটনকে তুলে ধরার বদলে সরকারের সাফল্যকেই খাটো করছে। বিজ্ঞাপন তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে বাংলার নতুন পর্যটন বিজ্ঞাপন এখন পর্যটন প্রচারের চেয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। যে বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য ছিল বাংলাকে বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল করে তোলা, সেটিই এখন উল্টো প্রশ্নের মুখে—বাংলার বিজ্ঞাপনে যদি বাংলাকেই খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সেই প্রচারের সার্থকতা কোথায়?

Hot this week

আদিবাসীদের চিকিৎসা করতে ওড়িশায় গিয়েছিলেন, খনিবিরোধী আন্দোলনে যোগের অভিযোগে আজ জেলবন্দি চিকিৎসক!

ওড়িশায় আদিবাসী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার...

জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তের ভারও জ্ঞানেশের হাতেই!’ আরটিআইয়ে অস্বস্তিতে কেন্দ্রের ভূমিকা

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের...

Topics

আদিবাসীদের চিকিৎসা করতে ওড়িশায় গিয়েছিলেন, খনিবিরোধী আন্দোলনে যোগের অভিযোগে আজ জেলবন্দি চিকিৎসক!

ওড়িশায় আদিবাসী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার...

জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তের ভারও জ্ঞানেশের হাতেই!’ আরটিআইয়ে অস্বস্তিতে কেন্দ্রের ভূমিকা

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্ম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের...

বুকস্টল ভাঙার পরেও এত বই বিক্রি! বামেদের কটাক্ষ রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর

বুকস্টলে হামলার অভিযোগ এবং রেকর্ড বই বিক্রির দাবি—বামেদের দুই...

Related Articles

Popular Categories