অসমে বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা-র একটি মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পাওয়া তাঁর কাছে এখন অগ্রাধিকার নয়। এই বক্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।একটি সাক্ষাৎকারে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি এমন কিছু আসনে প্রচারে যাননি যেখানে মূলত বাংলাভাষী মুসলিমদের সংখ্যা বেশি। তাঁর কথায়, ওই সব এলাকায় গিয়ে আলাদা করে ভোট চাওয়ার কোনও পরিকল্পনা তাঁর নেই। তবে কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় সমর্থন করে, তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। এই মন্তব্যের পর থেকেই নানা মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, কারণ অসমের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্যমন্ত্রীর এমন অবস্থান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ভোট মানে সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ, সেখানে একটি বড় জনগোষ্ঠীর কাছে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকে সঠিক বলে মনে করছেন না। তাঁদের মতে, এতে সমাজে বিভাজন আরও বাড়তে পারে।অন্যদিকে, শাসকদলের তরফে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, এটি আসলে একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী কৌশল। কোথায় প্রচার করা হবে, কোথায় হবে না—সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এই কৌশলের মাধ্যমে দল তাদের শক্ত ঘাঁটি আরও মজবুত করতে চাইছে বলে মত অনেকের।যে আসনগুলিতে মুখ্যমন্ত্রী যাননি, সেগুলিতে মূলত বাঙালি মুসলিমদের বসবাস বেশি। এই সম্প্রদায়ের ইতিহাস বহু পুরনো। ব্রিটিশ আমলে পূর্ববঙ্গ থেকে অনেক মানুষকে অসমে আনা হয়েছিল কৃষিকাজের জন্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা রাজ্যের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন, বিশেষ করে কৃষিক্ষেত্রে তাঁদের অবদান উল্লেখযোগ্য।তবে বর্তমান সময়ে এই সম্প্রদায়কে ঘিরে রাজনীতিতে নানা বিতর্ক রয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, সরকারের কিছু পদক্ষেপ বিশেষভাবে মুসলিমদের উপর প্রভাব ফেলছে। যেমন, বিভিন্ন জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার বলছে, এগুলো বেআইনি দখলদারি রুখতেই করা হচ্ছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এতে অনেক নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।এছাড়াও ‘অবৈধ অভিবাসী’ চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া নিয়েও মতভেদ রয়েছে। বিরোধীদের দাবি, এই নীতির ফলে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা হচ্ছে। যদিও সরকার বারবার জানিয়েছে, তারা আইন মেনেই সব পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং রাজ্যের নিরাপত্তা ও সম্পদ রক্ষাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসী দাবি আরও চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করছেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট বড় ব্যবধানে জয় পাবে। এই মন্তব্য নির্বাচনী লড়াইকে আরও তীব্র করে তুলেছে।ভোটের আগে এই মন্তব্য এবং কৌশল অসমের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। উন্নয়ন, প্রশাসন এবং মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ছাড়াও এখন গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। নির্বাচনের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে, এই কৌশল কতটা কার্যকর হল।
Popular Categories


