কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের আমলে দেশজুড়ে একের পর এক সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং যুবসমাজের কর্মসংস্থানহীনতার বিরুদ্ধে এবার এক নজিরবিহীন অনলাইন গণবিদ্রোহের সূচনা হয়েছে। খোদ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ ব্যবহারকারীরা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক ইন্টারনেট আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, যা এখন মোদী সরকারের জনবিরোধী শিক্ষানীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। শনিবার দেশের প্রধান বিচারপতি এই আন্দোলনকে এত ‘আবেগপ্রবণ’ বা ‘সেন্টিমেন্টাল’ভাবে না নেওয়ার পরামর্শ দিলেও, এই আন্দোলন যেভাবে কোটি কোটি যুবকের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, তাতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি। আদালতে আইনজীবী এন কে গোস্বামী যুক্তি দেন যে খোদ প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়ার পরেও ইন্টারনেটে এই নিয়ে একটি প্রচার চালানো হচ্ছে, যার জবাবে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন যে এটিকে যেন এত আবেগ দিয়ে দেখা না হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল সম্প্রতি একটি মামলার শুনানির সময়, যেখানে তরুণ সমালোচক ও নেট ব্যবহারকারীদের একাংশকে প্রধান বিচারপতি ‘তেলাপোকা’ এবং ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেন। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে জানান যে তাঁর মন্তব্যটি সাধারণ তরুণদের উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং যারা ‘ভুয়ো ডিগ্রি’ নিয়ে ঘুরছেন তিনি তাঁদের বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মোদী জমানায় কর্মহীন ও দিশেহারা যুবসমাজ ততক্ষণে এই মন্তব্যকে লুফে নেয় এবং নেটদুনিয়ায় বিজেপি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ‘মেন ভি ককরোচ’ বা ‘আমিও তেলাপোকা’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে একটি ঐতিহাসিক অনলাইন প্রতিবাদ শুরু করে। যুবসমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের আগুন সোশ্যাল মিডিয়ায় এতটাই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে যে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই আন্দোলনের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলের ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৯০ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং কংগ্রেসের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টের সম্মিলিত ফলোয়ার সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি।
শিক্ষা মন্ত্রকের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করা প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি এবং সরকারি স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার দাবিতে এই সিজেপি আন্দোলনের মাধ্যমে কোটি কোটি তরুণ এখন অনলাইন পিটিশন সই করছেন। যে প্রতিবাদ স্রেফ একটি মিম বা ইন্টারনেট রসিকতা হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা এখন দেশে চাকরি না পাওয়া এবং পরীক্ষা সংক্রান্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুবসমাজের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে। শনিবার এই বিতর্ক সংক্রান্ত আরও একটি জনস্বার্থ মামলা সুপ্রিম কোর্টে দ্রুত শুনানির জন্য পেশ করা হয়েছিল, যেখানে আদালতের ভেতরের মৌখিক মন্তব্যকে ইন্টারনেটে ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি দেশজুড়ে সক্রিয় ‘ভুয়ো আইনজীবীদের’ বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের দাবি জানানো হয়। তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এই বিষয়ে কোনো তাড়াহুড়ো দেখানোর প্রয়োজন নেই বলে জানান এবং স্পষ্ট করে দেন যে নিয়ম অনুযায়ী যথাসময়েই মামলাটির শুনানি হবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বড় বড় পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষা করা বিজেপি সরকার যখন দেশের কোটি কোটি ছাত্র ও যুবকদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়, তখনই এই ধরণের গণআন্দোলন ডিজিটাল দুনিয়া কাঁপিয়ে রাজপথের লড়াইকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।


